8.2 C
New York
April 10, 2020
Alorkantho24.com
Uncategorized ফিচার

বঙ্গবন্ধুর গ্রাম সমবায়, গরিব মানুষের বাঁচার উপায়-কামরুল হাসান বাদল,লেখক : কবি ও সাংবাদিক

মানুষ প্রথমেই মুক্তি চায় ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে। মানবমুক্তির প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেশ আগেই তা অনুধাবন করেছিলেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে তিনি ১৯৬৬ সালে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। সে ঐতিহাসিক ৬ দফার আন্দোলনের পথ ধরেই পরবর্তীতে স্বাধীকার এবং সবশেষে স্বাধীনতার আন্দোলন এবং চূড়ান্তভাবে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস দেশে পরিপূর্ণ খাদ্য উৎপাদন হয়নি। সে সময় বাংলাদেশ ছিল খাদ্য ঘাটতির দেশ। প্রচুর চাল আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটাতে হতো তখন। ১৯৭৪ সালে দেশে খাদ্য ঘাটতি চরমে ওঠে। ওই সময় আমেরিকা বিভিন্ন দেশে খাদ্য সাহায্য পাঠাতো একটি বিশেষ আইনের মাধ্যমে। যেটিকে বলা হয় পিএল-৪৮০। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক খাদ্য সম্পর্কিত একটি আইন। যা ফুড ফর পিচ হিসেবে বহুল পরিচিত ছিল। বাংলাদেশও আমেরিকা থেকে খাদ্য সাহায্য নিতো এই আইনের আওতায়। সে আইনে উল্লেখ ছিল কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য করলে সে দেশকে এই সাহায্য করা হবে না। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার বন্ধুরাষ্ট্র কিউবার পাট রপ্তানি করেছিলেন। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকে খাদ্যভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ফলে দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
এই তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের সিদ্ধান্ত নেন। বাকশাল গঠন করেন। বাকশাল ছিল তাঁর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি। অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনই ছিল এই বিপ্লবের লক্ষ্য। বাকশাল কর্মসূচি যদি তিনি সফল করে যেতে পারতেন তাহলে অন্তত ২০/২৫ বছর আগেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আসলে বাকশাল বা বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ ছিল-একটি জাতীয় দলের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই জাতীয় দলে সেনাপ্রধান, নৌপ্রধান, বিমানপ্রধান, তৎকালীন বিডিআর প্রধান, পুলিশ প্রধান, সচিব, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুবা সাংস্কৃতিক কর্মীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ নামে এই জাতীয় দল গঠনের লক্ষ্য ছিল দেশে একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সুখী-সমৃদ্ধ শোষণমুক্ত সমাজ তথা সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কিছু কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন সেগুলো হলো-
১. দুর্নীতিবাজ খতম করা, ২. ক্ষেত-খামার ও কলে-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি করা, ৩. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা, ৪. জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা, ৫. বাংলাদেশের পঁয়ষট্টি হাজার (তৎকালীন) গ্রামে বাধ্যতামূলক বহুমুখী সমবায় গড়ে তোলা, ৬. ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করে মহকুমাভিত্তিক (মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করে) প্রশাসনকে বিকেন্দ্রিকরণ করা। জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে জেলা গভর্নর নিয়োগ করে গণতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ৭. জনগণের দোরগোড়ায় বিচারব্যবস্থার সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে জনগণের নির্বাচিত বিচারকমণ্ডলি গঠন করে দেশের সর্বত্র গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা, ৮. স্বাধীনতার শত্রুদের চক্রান্ত প্রতিরোধ করে স্বাধীনতাকে সুসংহত করা।
‘একটি জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশকে তিনি প্রকৃত অর্থে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত করে চেয়েছিলেন। জনগণ তথা কৃষক-শ্রমিক-কুলি-মজুর- মেহনতি মানুষ নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারী, শ্রেণিচ্যুত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী তথা রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরের মানুষের সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল গঠন করে রাষ্ট্রের মালিকানা তাদের হাতে ন্যস্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাই সংবিধানের শুরুতেই লিখেছিলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের মালিক হইবে জনগণ’। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই বৈপ্লবিক কাজ করতে গেলে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারায় তা সম্ভব নয়। শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া শোষিত শ্রেণির মুক্তি কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পরপর তিনি বৃহৎ শিল্প-কারখানা এবং পাকিস্তানিদের মিল-কারখানাগুলো জাতীয়করণ করেছিলেন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি দেখতে পেলেন-তাঁর জাতীয়করণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না। দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে জাতীয় সম্পদ তথা জনগণের এই সম্পদগুলো এক প্রকার লুটেরাদের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি অনুধাবন করেছিলেন একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই বৈপ্লবিক পদক্ষেপই হলো বাকশাল শাসন ব্যবস্থা।

২। রাষ্ট্রায়ত্ত মিল-কারখানার মালিকানা শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত করে তিনি কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক গ্রাম সমবায়-প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামভিত্তিক বাধ্যতামূলক বহুমুখী সমবায় সংগঠনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন এ লক্ষ্যে তিনি প্রাথমিক অবস্থায় ১০০টি গ্রামে এই কর্মসূচি চালু করেন। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে ৬৫ হাজার (তৎকালীন) গ্রামে নবতর সমবায় পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে তিনি কৃষিজাত সকল ক্ষেত্রকে সমবায়ের অধীনে এনে এদের উন্নয়নে বিভিন্ন উপপরিষদ গঠনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। যেমন-
১. ভূমি মালিকানার হিসাব ও অন্যান্য পরিসংখ্যান এবং সমবায়ের তহবিল সংরক্ষণ উপ-পরিষদ, ২. ফসল বোনা ও সংগ্রহ উপ-পরিষদ, ৩. শাক-সবজি-ফল উৎপাদন, বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ উপ-পরিষদ, ৪. পোল্ট্রি ও ডেইরি অর্থাৎ হাঁস-মুরগি ও পশুপালন উপ-পরিষদ, ৫. মৎস্যচাষ উপ-পরিষদ, ৬. ক্ষুদ্রশিল্প ও কুটিরশিল্প পরিচালনা উপ-পরিষদ, ৭. সেচব্যবস্থা উন্নয়ন উপপরিষদ, ৮. জনশক্তি পরিচালনা উপ-পরিষদ, ৯. স্বাস্থ্য ও জন্মনিয়ন্ত্রণ উপ-পরিষদ, ১০. সমবায় শালিসী ব্যবস্থা উপ-পরিষদ, ১১. শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ উপ-পরিষদ, ১২. কৃষি উপকরণ সংরক্ষণ ও সরবরাহ উপ-পরিষদ, ১৩. ফসল বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বণ্টন উপ-পরিষদ, ১৪. ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ সরবরাহ এবং সমবায়ের বিক্রয় কেন্দ্র পরিচালনা উপ-পরিষদ. ১৫. যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন উপ-পরিষদ, ১৬. সমবায়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা উপ-পরিষদ, ১৭. সমবায়ের পরিকল্পনা উপ-পরিষদ, ১৮. বাজেট উন্নয়ন উপ-পরিষদ, ১৯. অডিট টিম, ২০. বাকশালের রাজনৈতিক সমন্বয় পরিষদ।
এই সমবায় গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ৪০০ থেকে ৫০০ একর জমি নিয়ে এই সমবায়ের আয়তন নির্ধারিত হবে। এবং এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ৫০০ থেকে ১০০০ পরিবার একটি সমবায়ে অন্তর্ভুক্ত হবে। সমবায় পরিচালনা পরিষদে প্রাথমিকভাবে কৃষি ও অন্যান্য সামাজিক কাজে অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোক অপরিহার্য । রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার কাজে নিয়োজিত কমপক্ষে পাঁচজন সদস্য থাকতে হবে। পরিষদ গঠিত হওয়ার পর সমবায়ের এলাকা সঠিকভাবে নির্ধারণ করে এলাকায় চাষাবাদী জমি, বসতবাড়ি, রাস্তা, খাল, নদী-নালা, পুকুর, পাহাড় ইত্যাদির নিখুঁত নকশা করা বা ম্যাপ তৈরি করতে হবে। পরিষদ সদস্যদের এক তৃতীয়াংশ ভূমিহীন কৃষক, এক অংশ ক্ষুদে কৃষক এবং বাকি অংশ মাঝারি ও ধনী-কৃষক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সমবায়ের উৎপাদন ও বণ্টনের মূল নীতি হল, যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থাধীনে উৎপাদিত ফসলের উৎপাদন ব্যয় এবং রাষ্ট্রকে প্রদত্ত অংশ ছাড়া বাকি অংশ ভূমি মালিক এবং সমবায়ের সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা। সমবায়ের মূলনীতি যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা হলেও বাস্তুভিটাও তৎসংলগ্ন খণ্ড জমিতে (রাষ্ট্রীয়ভাবে যা নির্ধারিত হয়) ব্যক্তি পর্যায়ে বা নিজ উদ্যোগে উৎপাদনের অধিকার সুনিশ্চিত থাকবে।
বঙ্গবন্ধুর এই বিপ্লবের বিষদ তুলে ধরা এই ছোট্ট পরিসরে সম্ভব নয়। আমি শুধু সামান্য ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে আমাদের জমি, কৃষক, জোতদার- মুনাফাখোর ও ফরিয়া এবং সামন্ত শ্রেণির চরিত্র বুঝে বঙ্গবন্ধু তেভাগা যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর এই চিন্তার অনেক বছর পর তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। মাছ, সবজি, ফল ইত্যাদি উৎপাদনেও ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে বটে কিন্তু তাতে মূল সংকট কাটেনি বরং দিনদিন অনেক সংকট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক তদারকির কারণে আমাদের কৃষিজমি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত থাকায় অতিলোভে ফসলে বিষ ছিটানো হচ্ছে। মাছে ফরমালিন দেওয়া হচ্ছে, প্রকৃত কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে বঞ্চিত হচ্ছে। কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিক্রি করতে না পারার সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভাগী ফড়িয়া ব্যবসায়ী। মূল কথা কৃষিখাত, মৎস্যখাত, ডেইরি ও পোল্ট্রিখাতে যে সমস্যাগুলো আজ বিদ্যমান সমবায় পদ্ধতির যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থায় এসব কিছুই থাকতো না। যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে কৃষিজমির পরিমাণও অনেক বৃদ্ধি পেতো। গ্রামে বেকার থাকতো না।

বঙ্গবন্ধু একটি ছোট নালা নিয়ে যেমন ভেবেছেন তেমন করে ভেবেছেন বিশাল বঙ্গোপসাগরের সংরক্ষিত সম্পদ নিয়ে, তিনি উচ্চ আদালত নিয়ে যেমন ভেবেছেন তেমনি করে ভেবেছেন তৃণমূল পর্যায়ে বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়েও। বঙ্গবন্ধু বাকশালের মাধ্যমে স্বার্থরক্ষা করতে চেয়েছিলেন গরিবের। এতে স্বার্থহানি ঘটেছিল সমাজের উচ্চশ্রেণির, সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির, সামন্ত শ্রেণির, লুটেরা পুঁজিবাদী শ্রেণির। তাই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে দেশের এই শ্রেণির যোগসাজশে বঙ্গবন্ধুকে উৎখাতের চেষ্টা করা হয়েছিল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় তারা তাতে সফলও হয়েছিল। কিন্তু দুঃখ ও কষ্ট হচ্ছে যে শ্রেণির স্বার্থের জন্য তাঁকে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হলো সে সর্বহারা শ্রেণি, গরিব ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষই বুঝল না বঙ্গবন্ধু তাদের জন্য ত্রাতাস্বরূপ ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু তার নিজের মতো করে শোষিতের গণতন্ত্র, যৌথ উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা করেছেন। তিনি বিদেশি ফর্মূলা বাংলাদেশে চাপিয়ে দিতে চাননি।
বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও চিন্তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাতে তার বাকশাল কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা না করলে হবে না। সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ না করার কারণে অনেকের কাছে বাকশাল একটি ভীতির নাম, গালির নাম, সংকোচ ও পরাজয়ের নাম বলে মনে হয়েছে। এবং অনেকে এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভুল সিদ্ধান্ত, বঙ্গবন্ধুর ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করতে চান। আমি বলতে চেয়েছি, বঙ্গবন্ধু কোনো রাজনৈতিক ভুল করেননি কখনো। বাকশাল কর্মসূচি তার কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি শোষিতের গণতন্ত্র চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন মানুষের সার্বিক মুক্তি। আর সে লক্ষ্যে মানুষের প্রথম ও অন্যতম প্রধান চাহিদা খাদ্য নিশ্চিত করতে জাতিকে প্রথমেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে গ্রাম সমবায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

বাকশাল একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল না। বরং বাকশালের মাধ্যমেই উপমহাদেশে তিনি ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রিকরণ করে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার তুলে দিতে চেয়েছিলেন।
দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা প্রণয়নের নেপথ্য সহযোগী, বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক রেহমান সোবহান ১ জানুয়ারি ২০২০ প্রথম আলো পত্রিকায় দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে বলেছেন, ‘তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) জীবনভর রাজনৈতিক সংগ্রাম শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বাঙালির স্বশাসনের জন্য ছিল না; বরং একটি ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল শ্রমজীবী মানুষের শোষণ ও আয় বৈষম্য কমিয়ে আনা’।
বঙ্গবন্ধুর সে স্বপ্নকে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি এখনো। বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমলেও ধনী-গরিবের বৈষম্য এখনো কমেনি বরং বেড়েছে। দেশে লুটেরা শ্রেণির দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোগবাদ বেড়েছে সমাজে। ধনীদের হাতে অধিকতর সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। সংসদ ধনী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তার হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ বড়লোকদের দলে পরিণত হচ্ছে। সুবিধাবাদী আদর্শহীন ব্যক্তিরা দলে ভিড়েছে ব্যাপকহারে। ফলে দলে এবং সরকারে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার কন্যা শেখ হাসিনা আজ একাই লড়াই করে যাচ্ছেন।
২০১৯ সালের শেষে দিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি নানামুখী চাপে পড়েছেন। দুর্নীতিবাজরা আজ এতই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও আজ কঠিন হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিবাজ, লুটেরা ধনিক-বণিক শ্রেণি সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে প্রাণ দিয়েছিলেন। আজ একই পরিস্থিতি, একই কায়দায় তার কন্যা শেখ হাসিনাকেও কোণঠাসা করার চেষ্টা হচ্ছে। তাঁর জীবনও আজ প্রচণ্ড হুমকির মুখে। একই শক্তি, এবারও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নকারীদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এই বিষয়গুলো খোলামেলাভাবে আলোচিত হওয়া দরকার। দরকার বঙ্গবন্ধু এবং তার আদর্শ নীতির বিরুদ্ধে প্রচারিত সকল মিথ্যার সঠিক জবাব তৈরি করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা। আমি বারবার বলতে চেয়েছি, বঙ্গবন্ধু জীবনে কোনো রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত নেননি। বাকশালকে গালি হিসেবে চিহ্নিত করা দেশের প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সকল মিথ্যার পাহাড় ডিঙিয়ে সত্যটি প্রকাশ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। তার দ্বিতীয় বিপ্লব শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়। বিশ্বের সকল নির্যাতিত মানবগোষ্ঠীর মুক্তির মহান আদর্শ। শোষিতের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহান মন্ত্র। তার দ্বিতীয় বিপ্লব তথা বাকশাল কর্মসূচি নিয়ে আরও ব্যাপক আলোচনা, গবেষণা হওয়া দরকার। দরকার বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে তাঁর মুক্তির মন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর নির্দেশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ছড়িয়ে দেওয়া।
মুক্তির প্রবক্তা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দর্শন বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত করা। আর সে কাজটি করতে হলে আগে আমাদের নিজেদেরই তার দর্শনকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে তাঁকে। বুঝতে হবে তার বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

Related posts

বঙ্গবন্ধুর আর্দশ এবং বিশ্বাসকে নিয়ে পথচলা বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম মহানগর

editor

উড়বে পতাকা চলচিত্র থিয়েটার ইন্সটিটিউটে প্রদর্শিত হয়

editor

করোনাভাইরাস- আমাদের মনোজগৎ-কামরুল হাসান বাদল লেখক: কবি, সাংবাদিক

editor

অমর একুশে বইমেলায় বাজছে বিদায়ের সুর জমে উঠেছে শেষের দিকে বইমেলা

editor

অগ্নিঝরা মার্চ এর স্মৃতিকথা ১৯৭১ এ দিনে-ফাহিমউদ্দিন আহমেদ- বীর মুক্তিযোদ্ধা

editor

প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্যাকেজ ঘোষণা

editor

Leave a Comment