17.1 C
New York
May 31, 2020
Alorkantho24.com
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

করোনা সংকটের চিকিৎসায় ভেন্টিলেটর

স্বর্ণালী প্রিয়া ডেক্সঃকরোনা সঙ্কটে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে, তা হলো- ভেন্টিলেটর। অনেকেই শব্দটি এই প্রথম শুনলেও করোনায় আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের নাম হলো এই ভেন্টিলেটর। মরণঘাতী ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে রোগীর অবস্থা এমন এক ধাপে চলে যেতে পারে যে, এই যন্ত্রটি ছাড়া জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়। তাই করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় এই যন্ত্রটি খুবই জরুরি।

এতে মহামারী রূপ নিয়েছে করোনা ভাইরাস। যাতে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন সাড়ে ৮ লাখ মানুষ এবং মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৩৮ হাজার। সারা পৃথিবীতেই এরকম একটি কঠিন সময়ে এই ভেন্টিলেটরের প্রচণ্ড অভাব পড়েছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল থেকেও বলা হচ্ছে যে, শুধুমাত্র ভেন্টিলেটর না থাকার কারণে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত অনেক রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি ভিত্তিতে ভেন্টিলেটর কিনতে চাইলেও সরবরাহের অভাবে এতো অল্প সময়ের মধ্যে যন্ত্রটি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সরকার যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো করে ভেন্টিলেটর উৎপাদনের কথা বিবেচনা করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন যেভাবে জরুরী ভিত্তিতে স্পিটফায়ার যুদ্ধবিমান তৈরি করেছিল, এখন ঠিক একইভাবে ভেন্টিলেটর উৎপাদনের কথাও বলা হচ্ছে।জরুরী ভিত্তিতে ভেন্টিলেটর উৎপাদনের জন্য ব্রিটিশ গাড়ি নির্মাণকারী ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। এমনকি তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যে যন্ত্রটি উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে বলেই ঘোষণা করেছে নিসান, রোলস রয়েস, ফোর্ড, ম্যাকলারেন, টেসলা, হোন্ডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি।

এদিকে, নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র বিল ডে ব্ল্যাসিও-ও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আগামী দশদিনের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটরসহ চিকিৎসা সামগ্রী ফুরিয়ে গেলে পরিস্থিতি মারাত্মক দিকে চলে যেতে পারে। ‘বর্তমান বিশ্বের হাতে যথেষ্ট সংখ্যক ভেন্টিলেটর নেই’ বলেই মন্তব্য করেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভেন্টিলেটর উৎপাদনকারী সুইস কোম্পানি হ্যামিলটন মেডিকেলের প্রধান নির্বাহী। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, “ইতালিতেও আমরা সেটা দেখেছি, দেখেছি চীনেও। আমরা ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশেও একই অবস্থা দেখেছি, আর এটাই বাস্তবতা।

করোনা ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে আক্রমণ করে, কখনও কখনও এমন অবস্থা তৈরি হয় যে রোগী ঠিক মতো শ্বাস নিতে পারে না। এসময় রোগীর দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে রোগীর মস্তিষ্ক ও হৃদপিণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গও অচল হয়ে যেতে পারে। এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ভেন্টিলেটর।

যন্ত্রটি তখন নাক কিম্বা মুখের ভেতর দিয়ে অথবা গলায় ছিদ্র করে লাগানো টিউবের সাহায্যে ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং দেহ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বের কিরে নিয়ে আসে। কম্পিউটারের সাহায্যে এই যন্ত্রটি পরিচালনা করা হয়।কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরস্থিতি গুরুতর হলে রোগীর নিউমোনিয়া হয়, ফলে তার ফুসফুসের নিচে অংশ পানি জমে যায় এবং তখন শ্বাস গ্রহণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।ভেন্টিলেটর ছাড়া ওই রোগী তখন আর শ্বাস নিতে পারে না। যন্ত্রটি তখন ফুসফুস থেকে পানি ও রোগীর দেহ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে নিয়ে আসে এবং ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করে কৃত্রিমভাবে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখে।

রোগী যতক্ষণ পযন্ত স্বাভাবিকভাবে নিশ্বাস গ্রহণ করতে না পারে ততক্ষণ ভেন্টিলেটর লাগানো থাকে। এসময় তিনি কথা বলতে পারেন না, মুখ দিয়ে কিছু খেতেও পারেন না। সেসময় তাকে টিউবের সাহায্যে খাবার দেওয়া হয়।

নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের পাঁচ শতাংশকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসা দিতে হয়েছে এবং তাদের অর্ধেক সংখ্যক রোগীকে কৃত্রিম যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করতে হয়েছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণে ফুসফুসে পানি জমে গেলে রোগী ভেন্টিলেটর ছাড়া শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারে না
বলা হচ্ছে, সারা বিশ্বে যত মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবেন তার ১০% থেকে ২০% রোগীকে আইসিইউতে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হতে পারে। এবং তাদের অনেকেরই বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন হবে এই ভেন্টিলেটরের।

করোনায় বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঁচ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি ৪৯ জন আক্রান্ত হয়েছে বলেই নিশ্চিত করেছে সকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। এ অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ভেন্টিলেটর সহায়তা একান্ত প্রয়োজন।

এ অবস্থায় করোনা মহামারী যদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার জন্য কমপক্ষে ২৫ হাজার ভেন্টিলেটর প্রয়োজন। এমনটাই জানিয়েছেন ল্যাবএইডের কর্ণধার এএম শামীম। সে ক্ষেত্রে তারা চীন থেকে ডিভাইসটি আনার পরিকল্পনা করছে। যেখানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই হ্রাস পেয়েছে।

এছাড়া আরেকটি উপায় হলো- স্থানীয়ভাবে ভেন্টিলেটর তৈরির সুযোগ অন্বেষণ করা এবং ডিভাইসগুলো সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবল প্রস্তুত করা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানি ওয়ালটনের পরিষেবা তালিকাভুক্ত করেছে সরকার।

এ বিষয়ে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, আমরা ইতিমধ্যে মেডট্রনিক দলের সাথে একটি কথা বলেছি, যে দলের প্রাধান বাংলাদেশী প্রবাসী ওমর ইশরাক। এবং তার দল আমাদের দেশে ভেন্টিলেটর তৈরিতে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছে।

পলক আরও বলেন, আমরা বুধবারের মধ্যে তাদের উৎস কোড এবং পেটেন্ট পেতে খুব আশাবাদী এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদনে যেতে পারব। আর এটা বাংলাদেশের জন্য বিশাল মাইলফলকে পরিণত হবে।

অন্যদিকে, ওয়ালটনও জীবন রক্ষাকারী এ যন্ত্রটি উৎপাদনে এর বিভিন্ন উপাদান আমদানির জন্য আবেদন করেছে সরকারের কাছে। অর্থাৎ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এর সুফল পাওয়া যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে এক হাজার ভেন্টিলেটর আমদানি করার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। পর্যায়ক্রমে আরও ১০ হাজার ভেন্টিলেটর আমদানির জন্য দেশের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে ৫০০ কোটি টাকা সুদ-মুক্ত ঋণ দিতেও সরকার প্রতি আহ্বান জানান ল্যাবএইড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাক্তার এএম শামীম।

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে ভেন্টিলেটর সঙ্কট একটি বড় সমস্যা, তবে চলমান করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ভেন্টিলেটরই মূল হাতিয়ার। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার যদি তাৎক্ষণিকভাবে ঋণ দেয়, তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে এক হাজার ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে।

কারণ এসময়ে করোনা দেশেও মহামারী রূপ নিতে পারে। আমাদের এখনও সময় আছে, যদি আমরা এখনই একসাথে কাজ শুরু করি, আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সক্ষম হব।

তাই আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ভেন্টিলেটর সংগ্রহের জন্য সরকারকে সুদমুক্ত ঋণে ৫০০ কোটি টাকা প্রদান করা উচিত বলেও দাবি করেন এই চিকিৎসক।

জীবন রক্ষাকারী ভেন্টিলেটর যন্ত্রটি খুবই জটিল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকশো যন্ত্রাংশ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোম্পানি আলাদা আলাদাভাবে এসব যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে থাকে। ফলে ভেন্টিলেটরের উৎপাদন হঠাৎ করেই বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

যারা সারা বছরে মাত্র এক হাজার ভেন্টিলেটর তৈরি করে থাকে, ভেন্টিলেটর প্রস্তুতকারক এমন একটি ছোট্ট কোম্পানি অ্যালাইড হেলথকেয়ার প্রডাক্টস। এর প্রধান নির্বাহী আর্ল রেফসলান্ড বলেছেন, “এসব ভেন্টিলেটর মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তবে আমরা তো গাড়ির চাকা তৈরি করছি না। ফলে এর উৎপাদনে সময় লাগবে।”

তাই কতোটা দ্রুততার সঙ্গে এই যন্ত্রটি তৈরি করা সম্ভব হবে তা নিয়ে অনেক কোম্পানি ইতোমধ্যে সংশয় প্রকাশ করেছে। কারণ এই যন্ত্রটি তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়। এটি তৈরি করতে দক্ষতার প্রয়োজন।

তৈরি করা হলেও সেটিকে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরেই তা বাজারে ছাড়া হয়। ধারণা করা হয়, একটি ভেন্টিলেটর তৈরি করে বাজারে ছাড়তে সাধারণত দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যেতে পারে। এর দামও হয় প্রচুর। একটি ভেন্টিলেটর কিনতে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার ডলার।

মূলত এ কারণেই অনেক কোম্পানি যাকে তাকে দিয়ে ভেন্টিলেটর তৈরির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

Related posts

Microsoft Employees Question C.E.O. Over Company’s Contract With ICE

Titu Tutul

করোনাভাইরাস মোবাইল ফোনে জীবিত থাকে ৯ দিন!

editor

পৃথিবী থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি দিনটা যেদিন মুছে যাবে.

editor

What Is a ‘Shadow Ban,’ and Is Twitter Doing It to Republican Accounts?

Titu Tutul

করোনার নামে সক্রিয় হ্যাকাররা

editor

Worried About the I.R.S. Scam? Here’s How to Handle Phone Fraud

Titu Tutul

Leave a Comment