কর্নফুলী নদীর দৃষ্টিনন্দন মোহনা

হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক নদী কর্ণফুলী।আরব বণিকেরা ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে যে বন্দর ব্যবহার করত, তা ছিল কর্ণফুলী মোহনার চট্টগ্রাম বন্দর। তাই সে সময়ের বিখ্যাত কবি ইমরুল কায়েস তার একটি কসিদায় ‘করণফুল’-এর নাম উল্লেখ করেছেন। কর্ণফুলী তার অববাহিকার সব মানুষকে বুকে ধারণ করে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। সুতরাং কর্ণফুলীর ইতিহাস মানে মানবজাতির ইতিহাস, মানবজাতিকে লালন করার ইতিহাস। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সব দিক থেকে কর্ণফুলী ঐতিহ্যবাহী।

 ইতিহাসে কিংবদন্তি। এ নদীর নামকরণের একটি উপাখ্যান রয়েছে- হারিয়ে যাওয়া কানের ফুল উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে রাজকুমারীর সাথে রাজকুমারও খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপ দিলে দু’জনেরই সলিল সমাধি হয়। সে বিয়োগান্তক ঘটনার কারণে এ নদীর নাম হয় কর্ণফুলী। মারমা অদিবাসীরা নদীটিকে বলে কিনসা খিয়ং (Kinsa Khyong)। প্রাচীন জনগোষ্ঠীর কাছে এ নদী ‘কাইজা’ নামেও পরিচিত ছিল।

পাশের দেশ ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পাহাড়-পর্বত ও গভীর অরণ্যে ঘেরা মিজোরাম রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত লুংলেই জেলা। জেলা সদর থেকে ৯৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড় ঘেরা থানাটি হচ্ছে টলাবুং (দেমাগ্রি)। টলাবুং বা দেমাগ্রির লুসাই পাহাড় থেকে আন্তর্জাতিক নদী কর্ণফুলীর উৎপত্তি। সেখান থেকে সুউচ্চ পাহাড় শ্রেণী অতিক্রম করে থেগামুখ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার থেগামুখ থেকে বড় হরিণার মুখ পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার কর্ণফুলীর ডান পাশে রয়েছে ভারত এবং বাম পাশে বাংলাদেশ। হরিণা মুখের পর থেকে কর্ণফুলী সম্পূর্ণ বাংলাদেশের। উতলা খরস্রোতা পাহাড়ি নদী কর্ণফুলী বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতে ১৮৭ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। উল্লেখ্য, কর্ণফুলীর দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য ২৭৫ কিলোমিটার। কর্ণফুলীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত দীর্ঘ পথজুড়ে দু’কূলে গড়ে উঠেছে নানা জনপদ ও নগরসভ্যতা। এ নদীর মোহনায় সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব পোতাশ্রয়ের। চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে ১৭ কিলোমিটার এগিয়ে কর্ণফুলী মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। একে জাতীয় অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহী বলা হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধিতে চির-চঞ্চলা খরস্রোতা কর্ণফুলীর ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশে যে উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়মিত গতিময়তা পাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ থেকে বৃহৎ অঙ্কের জোগান আসছে বলে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৪-৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ সর্বমোট ৮.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের পণ্যসামগ্রী রফতানি করে। যার মধ্যে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলারের পণ্যই রফতানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তাই যে বন্দর ঘিরে এত বিশাল একটি জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি নির্ভর করে, সে বন্দরের অস্তিত্বই নির্ভরশীল কর্ণফুলী নদীর ওপর। এ কারণে কর্ণফুলী আমাদের ঐতিহ্যের ধন, চির জাগরূক সত্তা, এককথায় কর্ণফুলী মানেই আমাদের জীবন।

এগার শতাব্দীতে বাংলাদেশের বুকে প্রায় এক হাজার ৫০০টি নদীর অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এখন মাত্র ২৩০টি নদী নাব্য। ১৯৭২ সালের দিকেও আমাদের দেশের নদীপথ ছিল ১৪ হাজার কিলোমিটারের মতো। এখন সর্বসাকুল্যে ছয় হাজার কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে নদীপথ রয়েছে মাত্র এক হাজার ২০০ কিলোমিটার। পৃথিবীতে যত উন্নত শহর দেখা যায়, তার বেশির ভাগই গড়ে উঠেছে নদ-নদী ও সমুদ্র উপকূলকে কেন্দ্র করে। একইভাবে চট্টগ্রাম শহরও গড়ে উঠেছে কর্ণফুলী নদীর কারণে। আমাদের শহর, বন্দর, উন্নতি, অগ্রগতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যে যে নদীর এত বিশাল অবদান তার প্রতি আমাদেরও বিশাল দায়িত্ব ও করণীয় রয়েছে। নদীর প্রতি মনোযোগী হওয়া, নজর দেয়া, যতœ নেয়া, তার পরিচর্যা করা অপরিহার্য বিষয়। অথচ আমরা এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন, অমনোযোগী।

আমরা প্রতিনিয়ত দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। দখল-দূষণে অন্যান্য নদীর মতো কর্ণফুলীও বিপন্ন। কর্ণফুলীর বেহাল দশা দেখে চট্টগ্রামবাসীর উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সীমা না থাকলেও নির্লিপ্ত প্রশাসন। হাজার হাজার কোটি টাকার বড় প্রকল্প অথবা ব্যাংক থেকে লোপাট হলেও কর্ণফুলী দখলমুক্ত করতে মাত্র এক কোটি ২০ লাখ টাকার বন্দোবস্ত হচ্ছে না। নদীর যেন কোনো মালিক নেই। মানব সৃষ্ট দূষণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং অবৈধ দখলাদারিত্বে কর্ণফুলী দিন দিন হচ্ছে শীর্ণ, দেখার কেউ নেই। কর্ণফুলীর প্রাণসঞ্চারণী ১৩টি খালসহ ৫৪টি ছোট-বড় খালের বেশির ভাগই দখল অথবা নানা অত্যাচারে বিলীন হয়ে গেছে। কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল। শিল্প কারখানাগুলোর ৯০ শতাংশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট বা বর্জ্য নিষ্কাশনের পরিবেশবান্ধব কোনো ব্যবস্থা নেই।ছোট-বড় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্য কর্ণফুলী ও হালদাতে গড়াচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতর বলছে, চট্টগ্রামের টিএসপি সারকারখানা, চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলী কাগজ মিল, চট্টগ্রাম শহরের কাছে কালুরঘাট, নাসিরাবাদ, ভাটিয়ারি, বাড়বকুণ্ড, পতেঙ্গা, ফৌজদারহাট, কাপ্তাই ও ষোলশহর এলাকায় অবস্থিত ১৯টি চামড়াশিল্প, ২৬টি বস্ত্রকল, দু’টি রাসায়নিক কারখানা, একটি তেল শোধনাগার, পাঁচটি মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, একটি ইস্পাত মিল, একটি পেপার রেয়ন মিল, আটটি সাবান কারখানা, চারটি রঙের কারখানা ও দু’টি সিমেন্ট কারখানার বর্জ্য প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে চলেছে। এসব মিল কারখানার বর্জ্যরে মধ্যে উল্লেখযোগ্য সায়ানাইড, ক্রোমিয়াম, পারদ ও ক্লোরিনসহ নানা প্রকারের এসিড, সিসা, দস্তা, ক্যাডিয়াম, নিকেল, ফসফোজিপসাম, লোহা প্রভৃতি ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য। এগুলো শুধু মানবদেহ নয়, জীববৈচিত্র্যের জন্যও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে। কিভাবে বা কোথায় এসবের প্রতিবিধান হবে তা কারো জানা নেই। প্রতিদিন ৩০০ টনের বেশি তরল, কঠিন, তৈলাক্ত, ধাতব, পচন ও অপচনশীল অপরিশোধিত বর্জ্য আটটি খালের (রাজাখালি, মহেশখাল, মনোহরখালি, বামুনি, গুপ্ত, গয়না, চাক্তাই, ফিরিঙ্গিবাজার) মাধ্যমে কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে। কাপ্তাই নতুন বাজার থেকে মোহনার মাথা পর্যন্ত ৮৮.৫ কিলোমিটার কর্ণফুলী তীরবর্তী ছোট-বড় ৪০টি বাজারের মওসুমি ফল ও ফলের উচ্ছিষ্টসহ খোলা লেট্রিন, হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগলের মল ও মৃতদেহ এককথায় সব ধরনের ময়লা আবর্জনা বিভিন্নভাবে কর্ণফুলীতেই ফেলা হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের গৃহস্থালির প্রায় ৪০ শতাংশ বর্জ্য ও পাহাড় ধসের মাধ্যমে কর্ণফুলী ভরাট হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে নদীটির পানিও।

কর্ণফুলী শুধু চট্টগ্রামবাসীর নয়, এটি সমগ্র দেশের প্রাণভোমরা। যেকোনো মূল্যে কর্ণফুলীকে দখল-দূষণমুক্ত করে তার প্রবাহ বহমান রাখতে হবে। কর্ণফুলীর স্রোত, নাব্যতা ও পানি আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। এ নদীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, নদীকে জীবন্ত রাখা দেশের সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান নেতা জেরেনিমোর অসাধারণ কথাটি উল্লেখযোগ্য- তিনি বলেছিলেন, ‘যখন শেষ গাছটি কাটা হবে, শেষ মাছটি ধরা হবে এবং শেষ নদীটির পানি বিষাক্ত হবে; তখন আমরা বুঝতে পারব, টাকা খেয়ে বেঁচে থাকা যায় না।’ তথ্য্জুলকরনাইন