সিনহাকে গুলি করেছিলেন ওসি প্রদীপও!

সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের শরীরে চারটি গুলি করেছিলেন বাহারছড়ার আইসি লিয়াকত আলী। তা ঘটনার পরপরই এসপির সঙ্গে ফোনালাপে স্বীকারও করেছিলেন তিনি। এমনকি টেকনাফ থানায় পুলিশের করা মামলার এজাহারেও তা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কক্সবাজার মেডিকেলে সিনহার সুরতহাল রিপোর্টে সদর থানার এস আই উল্লেখ করেছিলেন চারটি নয় ছয়টি গুলি লেগেছিল তার শরীরে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরাও বলেছেন একই কথা। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, আর দুই রাউন্ড গুলি কে করেছিল? এর সদুত্তরের জন্য অপেক্ষায় রাখছিলেন তদন্ত টিম ও মামলার তদন্তকারী দল।
তবে সিনহার নিহতের ঘটনায় দায়েরকরা মামলায় কারাগারে থাকা টেকনাফের বরখাস্ত ওসি প্রদীপ দাসই সেই গুলি দুটি করে ছিলেন বলে দাবি করেছেন বাহারছড়ার শামলাপুরের এক বাসিন্দা। মধ্য বয়সী ওই বাসিন্দা নিজেকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে একাত্তর টিভিকে ওই রাতের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। যদিও কক্সবাজারের এসপির সাথে ফোনালাপে ঘটনার পরপরই ওসি প্রদীপ দাস লিয়াকতকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নিজেই ঘটনাস্থলে আসার কথা জানিয়েছিলেন। যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
৩১ জুলাই ওই রাতের প্রত্যক্ষদর্শী দাবিকারী মধ্য বয়সী মানুষটি ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘সিনহা স্যার গাড়ি নিয়ে আসতিছিল ওদিক দিয়ে। আসার পর সিগন্যাল দিছে। সিগন্যাল দিয়ে সাইড করাইছে। সাইড করাইয়া রিভলভার দিয়া মানে হ্যান্ডসাপ করাইছে। উনি বাইর হইয়া এভাবে একটা পা বাইর করছে…. এভাবে হাত উঠাইছে। হাত উঠার পরে কোন কথা কোন কিছু না বলে ধ্রাম ধ্রাম উয়রাউরি (পরপর) তিনটা ফায়ার করছে (মূূূলত এটা হবে চারটা)। ফায়ার করার পরে গাড়ির ভেতরে চুল লম্বা একটা ব্যক্তি ছিল মুখটা ফর্সা করে। ওই ব্যক্তিটা বাইর হইয়া সিনহা স্যারকে এভাবে (ইশারায় জড়িয়ে দেখানো) ধরছে। এভাবে ধরার পরে ওরে দুইজন আইসা ধইরা ওই ওয়ালের পাশে নিছে।’
ওসি প্রদীপের সাথে লিয়াকতের ফোনালাপের কথা উল্লেখ করে ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরও বলেন, ‘লিয়াকত মোবাইল নিয়ে বলে… এক দৌঁড়ে এদিকে যায় আরেক দৌঁড়ে এদিকে আসে স্যার তিনটা করছি গুলি…স্যার তিন রাউন্ড করছি। কয় তো এখন কই? আসেন…দুই মিনিট হইছে না। শা কইরা নোহা নিয়া আইছে প্রদীপ স্যার। প্রদীপ দাশ আসার পরে যখন ওই লোকটা (সিনহা) ধরফরাইতেছে, প্রদীপে একটা পাড়া দিছে সিনার উপর কুত্তার বাচ্চা বলে। পাড়া দিয়ে ধ্রাম ধ্রাম এ করল তিন ফায়ার… না না, প্রদীপে করছে দুই ফায়ার। কিন্তু ও (লিয়াকত) চার ফায়ার করছে…কেডা লিয়াকত। চার ফায়ার করার পরে….প্রদীপ দুইটা করছে ফায়ার ভাইয়া। আমার চোখের সামনে করছে। কুত্তার বাচ্চা বলে পারা দিয়ে ও শুয়া অবস্থায় দুই ফায়ার করে…কিছুক্ষণ পর একটা ছারপোঁকা গাড়ি আসছে। সেটাতে তুলে দিছে তারে কক্সবাজার মেডিকেলে নিতে।’
সুরতহাল প্রতিবেদনে বুকে, কাঁধে, হাতে, পিঠে ও কোমরে গুলির জখমের কথা উল্লেখ রয়েছে। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত এজাহারে চারটি গুলির কথা উল্লেখ করেন। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে সিনহা মো. রাশেদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন এসআই মো. আমিনুল ইসলাম। কক্সবাজার সদর মডেল থানার এই এসআই নিয়ম অনুযায়ী যে অবস্থায় মৃতদেহটি পেয়েছেন, তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। ওই প্রতিবেদনে লেখা, ‌বাঁ পাশে কাঁধের নিচে গভীর রক্তাক্ত জখম একটি, বাহুতে একটি, বাঁ পাঁজরে একটি, বাঁ কোমরের ওপর একটি, পিঠের পেছনে একটি, কোমরের ভেতরে একটি—মোট ছয়টি গুলির রক্তাক্ত গভীর চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সুরহতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় উপস্থিত ছিলেন মর্গের কর্মী আহামদ কবির মনু। মৃত্যুর পর টেকনাফ থানায় পুলিশ মামলা করে। এজাহার অনুযায়ী গুলি ছুড়েছিলেন টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলী। এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত লেখেন, ‘সেনাবাহিনীর মেজর পরিচয়দানকারী ব্যক্তি কিছুক্ষণ তর্ক করে গাড়ি থেকে নেমে একপর্যায়ে কোমরের ডান পাশ থেকে পিস্তল বের করে গুলি করার জন্য উদ্যত হলে আইসি স্যার (লিয়াকত আলী) নিজের ও সঙ্গীয় অফিসার ফোর্সদের জানমাল রক্ষার্থে সঙ্গে থাকা তাঁর নামে সরকারি ইস্যুকৃত পিস্তল হইতে চার রাউন্ড গুলি করে।’
কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মঙ্গলবার সিনহা মো. রাশেদ খানের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী জানান, মঙ্গলবার জমা দেওয়া প্রতিবেদনে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সিনহার মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই রাত্রে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডে মেজর সিনহা তাঁর কক্সবাজারমুখী প্রাইভেট কারটি নিয়ে টেকনাফের বাহারছরা শামলাপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের চেকপোস্টে পৌঁছালে গাড়িটি পুলিশ থামিয়ে দেয়। তখন তিনি উপর দিকে তার হাত তুলে তার প্রাইভেট কার থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে বাহারছরা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রর ইনচার্জ লিয়াকত আলী পরপর ৩ রাউন্ড গুলি করে হত্যা করে বলে সেনা সদর থেকে গণমাধ্যমে প্রেরিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনা তদন্তে গত ২ আগস্ট চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মো. মিজানুর রহমানকে আহবায়ক করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্ত্বা বিভাগ। ৪ আগষ্ট থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে।
৫ আগস্ট দুপুরে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় টেকনাফের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন মেজর সিনহার বড়বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। মামলাটি ওইদিন রাত সাড়ে ১০ টার দিকে টেকনাফ থানায় হত্যা মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। যার মামলা নং সিআর-৯৪/২০২০।
আসামিরা হলেন- ওসি প্রদীপ ও আইসি লিয়াকত, এসআই নন্দলাল রক্ষিত, এসআই টুটুল, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কনস্টেবল কামাল হোসেন, কনস্টেবল আবদুল্লাহ আল মামুন ও কনস্টেবল মো. মোস্তফাকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের সঙ্গী ও ৩১ জুলাই এর ঘটনায় টেকনাফ পুলিশের দায়ের করা মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম সিফাতসহ ১০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে ওসি প্রদীপসহ ৭ পুলিশ সদস্য কারাগারে আছেন এবং তাদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।