একটি লিগ্যাল নোটিশ; রবীন্দ্রবিদ্বেষ না কি আত্মপরিচয়ের সঙ্কট » 

   কামরুল হাসান বাদল লেখক কবি, সাংবাদিক »  ৬ ও ৭ আগস্ট যথাক্রমে দৈনিক যুগান্তর ও দেশ রূপান্তর পত্রিকায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেন। লেখাটি প্রকাশের পর ১৬ আগস্ট অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে ‘প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া’র দাবি জানিয়ে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠায় দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক আলবাইয়্যিনাতের সম্পাদক মুহম্মদ মাহবুব আলম। লিগ্যাল নোটিশ পাওয়ার পর আইনজীবীর মাধ্যমে সেই নোটিশের জবাব দিয়ে তা প্রত্যাহার করতে বলেছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ২৩ আগস্ট অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া নোটিশদাতার আইনজীবীকে জবাব পাঠান।
নোটিশের জবাবে মুহম্মদ মাহবুব আলমের আইনজীবীকে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া কী বলেছেন তা পাঠ করা আমাদের জন্য জরুরি কারণ তাতে আমাদের সাধারণ মানুষের মতামতও মিলে গেছে, “আপনার পাঠানো লিগ্যাল নোটিশ মতে আমার মক্কেলের লিখিত ‘রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বিগত ৭ আগস্ট দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশ হয় এবং সেই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু পাঠ করার পর আপনার মক্কেলের নিকট ওই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু অসত্য, বিকৃত ও আপত্তিকর মনে হয়েছে।” কিন্তু, আমাদের মক্কেল কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধে তার নিজস্ব মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে, যার পেছনে রয়েছে আমাদের মক্কেলের নিজের মতো করে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পাঠ। এই মত প্রকাশের অধিকার সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত এবং আমাদের মক্কেলের প্রবন্ধে অপরকে অপমান বা হেয় করার কোনো উপাদান ছিল না। আপনার মক্কেল হয়তো অবগত আছেন যে, আমাদের মক্কেলও সুদীর্ঘ ছয় দশকের অধিক কাল ধরে সাহিত্য, দর্শন ও অন্যান্য বিষয়ে লেখালেখির কারণে বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে স্বীকৃত এবং পাঠকনন্দিত। তিনি রবীন্দ্রনাথকে যেভাবে পাঠ করেছেন তার ভিত্তিতেই তিনি উপরোক্ত প্রবন্ধে নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন। আমাদের মক্কেল মনে করেন, সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রে কারো আইনি অধিকার ভঙ্গের ব্যাপার থাকে না। কারণ এতে সত্য-মিথ্যার উপস্থিতি থাকে না, থাকে কোনো বিষয়কে দেখার, বোঝার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের মক্কেলের লিখিত প্রবন্ধের কারণে আপনার মক্কেলের কোনো আইনগত অধিকার বা স্বার্থ ভঙ্গের বিষয় জড়িত নেই বিধায় তিনি উপরোক্ত লেখার কারণে কোনোভাবেই সংক্ষুব্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া আমাদের মক্কেল উপরোক্ত প্রবন্ধ আপনার মক্কেলকে উদ্দেশ্য করে লেখেননি।’
এই প্রবন্ধ পাঠে আলবাইয়িনাতের সম্পাদক মুহাম্মদ আলমের সংক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ কী? প্রবন্ধটিতে ড. সিরাজুল ইসলাম এক স্থানে লিখেছেন, ‘এক কথায় বলতে গেলে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের মূল ভূমিকাটি ছিল সাংস্কৃতিক। এই যে তার সংস্কৃতিচর্চা, এর মধ্যে সাহিত্য আছে, গান তো অবশ্যই রয়েছে, যে-গান সম্পর্কে অত্যন্ত সংগতভাবেই তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বাঙালিকে তা গাইতে হবে। বাঙালি যত দিন বাঙালি থাকবে ততদিন রবীন্দ্রনাথের গান যে অবশ্যই গাইবে। রবীন্দ্রনাথের গান ভারতের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেয়েছে, সেটাও খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ভারতে বাঙালির স্থান আজ যতই প্রান্তবর্তী হোক না কেন, রবীন্দ্রনাথ মোটেই প্রান্তে ছিলেন না, ছিলেন কেন্দ্রে।’ প্রফেসর ইসলাম আরও লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, কিন্তু তবু তার পক্ষে না-জড়িয়ে উপায় থাকেনি, ওই রুচিবোধের কারণেই। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ তিনি যতটা কার্যকর ও সাংস্কৃতিকভাবে করেছিলেন
তেমনভাবে অপর কোনো ভারতবাসী করতে পারেননি। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে তিনি যোগ দিয়েছিলেন, স্বভাবতই; কিন্তু পরে এর উগ্র ও সামপ্রদায়িক প্রবণতা দেখে পিছিয়েও এসেছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে ভেবেছেন। কী ভেবেছেন সেটাও জানা দরকার।’
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এটি ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজস্ব মত হলে তাতে অধিকাংশ বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি বা বিশ্বাসটাই উঠে এসেছে। প্রশ্ন হলো, একটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর সঙ্গে কারও মতের মিল না হলে তিনি পাল্টা আরেকটি প্রবন্ধ লিখতে পারেন। শুধু তাই নয় এই নোটিশের বাদি যিনি তিনি তাঁর পত্রিকাতেও এটি লিখতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথে না গিয়ে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে গেলেন কেন? এটা কি মিডিয়ায় প্রচার পাওয়ার কোনো কৌশল? না কি রবীন্দ্রবিদ্বেষ, না কি আত্মপরিচয়ের সঙ্কট? বাঙালি মুসলমানরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কেন গর্বিতবোধ করবেন- এমন প্রশ্নও তুলেছেন নোটিশদাতা। এমন প্রশ্ন নতুন নয় এবং এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই জাতীয় সংগীত, রবীন্দ্রনাথ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন ঘটনা দেখে-শুনে সচকিত হই, বিস্মিত হই না। তবে সিরাজুল ইসলামকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর ঘটনায় এবার সামান্য চমকিত হয়েছি তার কারণ লেখালেখির কারণে বিশেষ করে প্রবন্ধের কারণে কাউকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর সংবাদ আমার জানা নেই, যেখানে প্রবন্ধটি সর্বতোভাবে একটি নির্দোষ পর্যবেক্ষণ। তবে লিগ্যাল নোটিশের ভাষা পড়ে গত শতকের ছয় দশকে পাকিস্তানি সেনাশাসক জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাটি মনে পড়ল। বাঙালি জাতিসত্তার প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথকে পাকিস্তানে নিষিদ্ধ করা করতে গিয়ে সামপ্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের অবৈধ শাসকদের ভাষা ছিল লিগ্যাল নোটিশে ব্যবহৃত ভাষার অনুরূপ। সেই ঘটনার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেছে, এর মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং সে স্বাধীন দেশ আজ ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে পরিচিত পাকিস্তানের চেয়ে সব দিক থেকেই এগিয়ে আছে তারপরও আইয়ুব খান এবং তাদের সাঙ্গাতদের প্রেতাত্মা এদেশ থেকে এখনো যায়নি। তাদের ছানাপানারা এখনো রবীন্দ্রনাথ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অবশ্য এটা বাঙালি মুসলমানের একটি অংশের জন্য অস্বাভাবিক নয়, যারা এখনো আত্ম-পরিচয়ের সংকটে ভুগছেন।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বারবার নানাভাবে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে ড. আনিসুজ্জামান লিখেছিলেন, ‘বাঙালি পরিচয়কে এইসব অন্য পরিচিতির সঙ্গে- ভারতীয়, হিন্দু ও মুসলিম পরিচিতির সঙ্গে- পাল্লা দিতে হয়েছে। ঔপনিবেশিককালের বাংলায় বাঙালিত্বের শক্তি প্রদর্শনের শেষ মহামুহূর্ত এসেছিল ১৯২৩-২৪ সালে- যখন চিত্তরঞ্জন দাশের (১৮৭০-১৯২৫) অধিনায়কত্বে বাংলার হিন্দু-মুসলমান নেতারা বেঙ্গল প্যাক্টে স্বাক্ষর করেন। এতে যে সম্ভাবনার দ্বার খুলে গিয়েছিল, চিত্তরঞ্জনের অকাল মৃত্যুতে তা রুদ্ধ হয়ে গেল।’
মানুষের আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘একজন মানুষ একইসঙ্গে অনেক কিছু, তাই তাকে নানাভাবে চিহ্নিত করা যায়- তার ভাষা দিয়ে, লিঙ্গ দিয়ে, গায়ের রং দিয়ে, ধর্ম দিয়ে, শ্রেণি দিয়ে, পেশা দিয়ে, বৈবাহিক মর্যাদা দিয়ে, এমনকি খাদ্যাভ্যাস দিয়ে (যেমন, নিরামিষাশী)। একজনের একটি ব্যক্তিগত পরিচয় থাকতে পারে, আবার সংস্থাগত, দলগত, জাতিগত কিংবা ভৌগোলিক পরিচয় (যেমন, এশীয়) থাকতে পারে। এসব পরিচিতির কিছু কিছু পরিবর্তনীয় আবার কিছু কিছু অপরিবর্তনীয়। সাধারণত এক ধরনের পরিচিতি অন্য ধরনের পরিচিতির সঙ্গে বিনিময়যোগ্য নয়- যেমন, ভাষার সঙ্গে ধর্মবিশ্বাস তুলনীয় নয়। তাই কেউ হিন্দু কি বৌদ্ধ কিংবা মারাঠি কি গুজরাটি, তা জানতে চাওয়া যায়, কিন্তু তিনি বাঙালি না মুসলমান, এ প্রশ্ন অচল। তবে অনেক সময়ে বেশ কয়েক ধরনের পরিচিতিকে একসঙ্গে গাঁথা চলে। যেমন, কাউকে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন মহিলা আইনজীবী বলে যদি আমরা পরিচয় করিয়ে দিই, তবে একইসঙ্গে তাঁর গাত্রবর্ণ, জাতীয়তা, লিঙ্গ ও পেশা- এই চার ধরনের পরিচিতিকে কোনো অসঙ্গতি ছাড়াই একসূত্রে বাঁধা চলে। আবার কখনও কখনও এক ধরনের পরিচিতিকে তার অন্তর্গত নানাভাগে ভাগ করা যায়। যেমন, ধর্মবিশ্বাসগতভাবে একজন হিন্দুকে শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব বলে তার সমপ্রদায়গত পরিচয়ে, ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ প্রভৃতি বলে বর্ণগত পরিচয়ে, বারেন্দ্রী, বঙ্গজ, রাঢ়ী বলে অঞ্চলগত পরিচয়ে এবং তারও পরে পেশাগত ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করা রীতিসিদ্ধ ছিল।’
বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের সঙ্কট মোচনে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ এবং বঙ্গবন্ধু একই মত দিয়েছেন। তাঁরা দুজনেই আগে বাঙালি পরে মুসলমান বলে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। বাঙালি মুসলমানরা জাতিতে বাঙালি আর সমপ্রদায়গতভাবে মুসলমান। আলবাইয়্যিনাতের সম্পাদকও তাই তিনি এই সত্য যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করেন না কেন। মুসলিম জাতিসত্তা বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। আছে বিভিন্ন জাতির মধ্যে মুসলিম সমপ্রদায়। যদি তাই হতো তাহলে আমরা আর আরবের মুসলমানরা একই হয়ে যেতাম। তাদের কাছে মিসকিন বলে গণ্য হতাম না।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক