ধ্বংসপ্রাপ্ত সিন্ধু সভ্যতা ও আমাদের ভবিষ্যৎ » কামরুল হাসান বাদল লেখক কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। এর ফলে বরফ গলছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে এ পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এই পরিবর্তন যে শুধু বর্তমান সময়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, এমনটা নয়। হাজার বছর আগের সভ্যতাও বিলীন হয়েছে এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে। এমনটাই জানান দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বদলে গিয়েছিল বর্ষা। এতে পতন হয় সিন্ধু সভ্যতার।
এই নিয়ে কেওস নামে সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার গুহাগুলোতে জমে থাকা স্ট্যালাগমাইট খনিজের নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে গত ৫ হাজার ৭০০ বছরে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের গড় চরিত্র বুঝতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। নিশান্ত মালিক বলেন, গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে এভাবে বহু শতাব্দী পুরোনো জলবায়ু বুঝতে চাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ।
এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার পতনের কারণ হিসেবে একদিকে যেমন যাযাবর ইন্দো-আর্যদের ক্রমাগত আক্রমণের কথা বলা হচ্ছে। তেমনই গুরুত্ব পেয়েছে সেই সময় ঘটে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভূমিকম্পের প্রসঙ্গও। এ ছাড়া সিন্ধু সভ্যতার শুরুর দিনগুলোতেই বর্ষার চরিত্রে একটা বড় রকমের পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। আবার এই সভ্যতা যতই বিলুপ্তির দিকে এগিয়েছে, ওই অঞ্চলের বর্ষার চরিত্রও ক্রমশ বদলে গেছে। রচেস্টার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকেরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনই যে সিন্ধু সভ্যতার পতনের মূল কারণ, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত বহন করে।
সে ঘটনার কয়েক হাজার বছর পর শুধু সিন্ধু অঞ্চল নয় সারা বিশ্বই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম সর্বাগ্রে। বাংলাদেশও বর্ষার পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে অন্তত তিন দশক ধরে।
বিশ্ব বর্তমানে একটি মহামারির কবলে। তারপরও দেশে দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় তথা ঝড়, সাইক্লোন, বন্যা থেমে নেই। বিশ্বের একদিক বন্যায় ভেসে যাচ্ছে মানুষের বসত, জমি, ঠিকানা অন্যদিকে খড়া ও আগুনে জ্বলে যাচ্ছে বনাঞ্চল। কয়েকদিন আগে একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে আইসল্যান্ডে জমে থাকা বিশাল বরফ গলে যাচ্ছে। এভাবে জমে থাকা বরফ যদি গলতে থাকে তাতে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে ডুবে যাবে মালদ্বীপের মতো দেশ। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের নিম্নাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে কোটি কোটি মানুষ।
সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একটি জাতীয় দৈনিক। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন তিন গবেষক তাঁরা হলেন, অনিমেষ গাইন: পরিবেশ পরিকল্পনা বিষয়ে গবেষণা ফেলো, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। শিবলী সাদিক: উপকূল ব্যবস্থাপনা গবেষণা ফেলো, নেদারল্যান্ডসের আইএইচই ডেল্ফট ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার এডুকেশন। মফিজুর রহমান: বদ্বীপ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ফেলো, জার্মানির কোলন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স। তাঁরা প্রচলিত ধারা ও ধারণার বাইরে নতুন কিছু পরামর্শ ও কৌশল উপস্থাপন করেছেন। তাঁদের মতে, সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ভূমিক্ষয়ের হার অনেক বেশি। পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক কারণে ভূমি নিমজ্জনের (বা ভূমি ডুবে যাওয়া) হারও এ অঞ্চলে বেশি (বছরে ৫.২ থেকে ৮.৮ মিলিমিটার)। তাঁরা বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারও এ অঞ্চলে অনেক বেশি বছরে প্রায় ৪ মিলিমিটার। বিশ্বের অন্যান্য বদ্বীপের তুলনায় এ হার অনেক বেশি, যা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
আমরা জানি, হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বহু পথ অতিক্রম করে বছরে ১০০ কোটি টনের বেশি পলি নিয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে মেশে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদ-নদী সম্মিলিতভাবে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলি বহন করে। এই পলি পড়তে পড়তে জমে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে উর্বর ভূমি। এ ভূখণ্ডই আমাদের বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, বঙ্গীয় বদ্বীপ এখনো অপরিণত এবং নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুধু প্রাকৃতিক কারণেই কয়েক হাজার বছরে গঙ্গা ও পদ্মা গতিপথ পরিবর্তন করেছে। পশ্চিম থেকে পূর্বে সরে গেছে। এর ফলে বঙ্গোপসাগর-সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পলি ও মিঠাপানির প্রবাহ ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বিপরীতে বাড়ছে লবণাক্ততা। জমিতে পলি জমার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে এ বদ্বীপে কোথাও কোথাও ভূমির ক্ষয় বা বৃদ্ধি হচ্ছে। আশির দশকে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন শুরু হয় ব্যাপকভাবে। এ জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাঁধ কেটে লবণপানি ভেতরে ঢোকানো হয়। এ ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা উপকূলীয় এলাকায় এসে চিংড়ি চাষ বাড়াতে থাকেন। এর ফলে চিরসবুজ প্রকৃতি অল্প সময়ের মধ্যে লবণজলের প্রভাবে বৃক্ষহীন ধূসর প্রান্তরে পরিণত হয়। এর সঙ্গে উপকূলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগও বেড়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতির এ পরিবর্তন আমলে না নিয়ে সেখানে একের পর এক বড় উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণ চলছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের বড় অংশকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
শুধু প্রকৃতি নয়, বাংলাদেশ বদ্বীপ নানা রকম আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও গেছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমল থেকে এখানে নদীকে নানাভাবে শাসন করার চেষ্টা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, যা নদীর পলি ও মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাসের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। অর্থাৎ যখন থেকে নদীর স্বাভাবিক গতি পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়েছে, নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, নদী শাসনের নামে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে তখন থেকে সর্বনাশের শুরু হয়েছে।
তথ্যের জন্য গবেষকরা দুটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তার একটি হলো ১৯২৫ সালে প্রকাশিত তৎকালীন বেঙ্গল পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ডা. বেন্টলির বাংলায় ম্যালারিয়া ও কৃষি। অন্যটি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত স্যার উইলিয়াম উইলকঙের বাংলায় প্রাচীন কৃষি পদ্ধতির ওপর দেওয়া বক্তৃতা সংকলন।
ওই বই দুটিতে বলা হয়েছে, ‘উপনিবেশ সময়ে রেলপথ ও নদীভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ, বিকল্প খাল খনন, সেচব্যবস্থা এই অঞ্চলের নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। ওই সময় থেকেই নতুন নতুন বিপর্যয়ের শুরু হয়।
এই প্রক্রিয়া পাকিস্তান শাসনামল হয়ে আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও চলমান আছে। আমাদের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যে বেড়িবাঁধগুলো ষাটের দশকে নির্মিত হয়ে এখনো টিকে আছে, তা মূলত বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দাতা সংস্থাগুলোর প্রস্তাবে নির্মিত হয়। পাকিস্তান আমলে শুরু ওই বেড়িবাঁধগুলো পরবর্তী সময়ে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততার মতো বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়েছে।’
বাংলাদেশে গত শতাব্দীর সাত দশক থেকে নদীতে স্লুইসগেট দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেল। কয়েক বছরের মধ্যে শত শত স্লুইসগেট নির্মিত হয়ে গেল। কিন্তু এই স্লুইসগেটগুলো উপকারের চেয়ে অপকার করল বেশি। কয়েক বছরের মধ্যে নদীগুলো মরে গেল। অন্য দেশের বাস্তবতা আর আমাদের দেশের বাস্তবতা এক নয় সেটি বুঝতে বুঝতে বেশি দেরি হয়ে গেল। আমাদের নদী-খাল পলিবাহিত কাজেই এদেশের সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে এ দেশের পরিবেশ অনুযায়ী। স্লুইসগেটের ধারণা ও প্রয়োগ ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল। ঠিক এই ধারণাটিই পোষণ করেছেন এ তিন গবেষক। তাঁরা প্রতিবেদনে লিখেছেন,” নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে, বিদেশি পরামর্শের জন্য অপেক্ষা না করে, শুধু আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যানির্ভর না হয়ে, দেশের নদী ও মাটি নিয়ে অন্য যে জ্ঞানের শাখাগুলো আছে, তাদেরও এ ব্যাপারে যুক্ত করতে হবে। ভূতত্ত্ব, সমাজবিদ্যা থেকে শুরু করে পরিবেশবিদ্যাকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। দেশেই যেন গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভব হয় আমাদের সমস্যার সমাধান।’
সবশেষে তাঁরা একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন- ‘টেকসই উন্নয়নের নামে আমরা যদি আবারও আগের মতোই বড় অবকাঠামোনির্ভর ব্যবস্থাগুলো প্রয়োগ করতে থাকি, তাহলে মায়া বা ইস্টার দ্বীপ বা রুয়ান্ডার মতো আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের পতন দেখতে হয়তো বেশি প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে না।’
বদ্বীপ অদিবাসীদের জীবন খুব সহজ নয়। এই দেশটির মোট আয়তনের এক তৃতীয়াংশ পাঁচ বা তার কম নিচু এলাকা। বদ্বীপ অদিবাসীদের বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, পানি দূষণের মত হুমকি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ২০৫০সালে দেশটির ১৪% শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হবে। পরিণামে ৩০ মিলিয়ন লোক জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, পানি দূষণের মত হুমকি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশের মত নেদারল্যান্ডও একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মত তারাও একই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বাংলাদেশে ও নেদারল্যান্ড একত্রে ডেল্টা পরিকল্পনায় কাজ করছে। ডেল্টা পরিকল্পনা হল দীর্ঘমেয়াদি, একক এবং সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা। এই পরিকল্পনায় সুপারিশগুলো বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক