চলচ্চিত্রের অভিনেতা সাদেক বাচ্চু চলে গেলেন না ফেরার দেশে

 

আজ সোমবার(১৪ সেপ্টেম্বর)গুণী অভিনয়শিল্পী সাদেক বাচ্চু না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি।ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।আজ দুপুর ১২টা ৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।কিছুদিন আগেও ক্যামেরার সামনে ছিলেন তিনি। একটা সময় চুটিয়ে কাজ করেছেন। মঞ্চে, বেতারে, টিভিতে, সিনেমায়, সর্বত্র দাপুটে বিচরণ ছিল তাঁর। পাঁচ দশকের লম্বা ক্যারিয়ার বাচ্চুর। তবে নব্বই দশকে এহতেশামের ‘চাঁদনী’ সিনেমাতে অভিনয়ের পর জনপ্রিয়তা পান খলনায়ক হিসেবে। এই পরিচয়েই দেশজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সাদেক বাচ্চুর।

করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর সাদেক বাচ্চুর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর তার অবস্থা আরও ‘ক্রিটিক্যাল’ হতে থাকে। সর্বশেষ  আবারও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হন সাদেক বাচ্চু। মৃত্যুকালে সাদেক বাচ্চুর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রেখে গেছেন।

ভিলেন ছাড়াও নানামুখী চরিত্রে বলিষ্ঠ অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ একটু দেরিতেই পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’–এর জন্য পুরস্কার পান।

রেডিও, টেলিভিশনে যাওয়ার আগে মঞ্চে ওঠেন সাদেক বাচ্চু। শিশুকাল থেকে মঞ্চের সঙ্গে তাঁর বন্ধন। মতিঝিল থিয়েটার তাঁর নাট্যদল। দলের সভাপতি ছিলেন তিনি। নিজেই নাটক রচনা করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন।

মহিলা সমিতিতে এক নাটকে তাঁর অভিনয় দেখেন তখনকার প্রভাবশালী টিভি প্রযোজক আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইমাম। তিনি সাদেক বাচ্চুকে নিয়ে যান টিভিতে। তিনি অভিনয় করেন ‘প্রথম অঙ্গীকার’ নাটকে। চুয়াত্তর সালের ঘটনা এটি। তাঁর অভিনীত নাটকের সংখ্যা হাজারের ওপর। প্রথম অভিনীত সিনেমা শহীদুল আমিন পরিচালিত ‘রামের সুমতি’।

সাদেক বাচ্চু’ নামটি তিনি পান এহতেশামের কাছ থেকে। তাঁর আসল নাম মাহবুব আহমেদ। ‘চাঁদনী’ সিনেমা থেকে তাঁর নাম বদলে যায়। বদলে যায় তাঁর খ্যাতির ধরনও। সাদেক বাচ্চু অভিনীত সিনেমার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।বই পড়ে সময় কাটাতেন এই অভিনেতা। ২০১৩ সালে তিনি বাংলাদেশ ডাকঘরের চাকরি থেকে অবসর নেন। ১৯৭০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে চাকরিতে ঢোকেন। তাঁর বাবা ছিলেন ডাকঘরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁর মৃত্যুর পর সাদেক বাচ্চুকে চাকরি দেওয়া হয়। পাঁচ বোন, তিন ভাই, বিধবা দাদি, বিধবা মাকে নিয়ে ছিল তাঁর বিশাল সংসার। সেই সংসারের দায়িত্ব তাঁকে বহন করতে হয়।

স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পারিবারিকভাবে সুখী ছিলেন সাদেক বাচ্চু। তবে জীবনের লম্বা সময় চাকরি, অভিনয়, সংসার নিয়ে সংগ্রামে কেটেছে তাঁর।

চাকরি করেও এত নাটক, সিনেমাতে কীভাবে কাজ করা সম্ভব হলো? এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে সাদেক বাচ্চু জানিয়েছিলেন, একসময় তাঁর অফিস ছুটি হতো দুইটায়। ডে-শিফট ধরতেন দুইটার পর। নাইট শিফটে তাঁর অফিস নেই। শুক্র, শনি দুদিন অফিস বন্ধ। পরিচালকরা তাঁকে সহযোগিতা করতেন। ছাড় দিতেন অভিনয়শিল্পীরাও। সবার সহায়তায় এত কাজ করা সম্ভব হয়েছে।

সাদেক বাচ্চুর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- জোর করে ভালোবাসা হয় না (২০১৩), জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার (২০১৩), জীবন নদীর তীরে (২০১৩), তোমার মাঝে আমি (২০১৩), ঢাকা টু বোম্বে (২০১৩), ভালোবাসা জিন্দাবাদ (২০১৩), এক জবান (২০১০), আমার স্বপ্ন আমার সংসার (২০১০), মন বসে না পড়ার টেবিলে (২০০৯), বধূবরণ (২০০৮), ময়দান (২০০৭), আমার প্রাণের স্বামী (২০০৭), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), প্রিয়জন (১৯৯৬), সুজন সখি (১৯৯৪)।

৫০ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে সাদেক বাচ্চু বেতার, নাটক, চলচ্চিত্র, সর্বত্র কাজ করেছেন। তবে নব্বই দশকে এহতেশামের ‘চাঁদনী’ ছবিতে অভিনয়ের পর জনপ্রিয়তা পান খলনায়ক হিসেবে। এই পরিচয়েই দেশজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সাদেক বাচ্চুর। এ ছবির পর তার নাম মাহবুব আলম থেকে হয়ে যাবে সাদেক বাচ্চু। খলনায়ক ছাড়াও নানামুখী চরিত্রে দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন সাদেক বাচ্চু। তার অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘বিদ্রোহী’। সাদেক বাচ্চু তার অভিনয় ক্যারিয়ারে স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য সম্মাননার পাশাপাশি ২০১৮ সালে ‘একটি সিনেমার গল্প’–এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।