কাপ্তাই জুমচাষ

আদিবাসী পাহাড়িদের প্রধান কৃষিকর্ম জুম চাষের (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ চাষাবাদ) জমি। বাধ্য হয়ে জুমিয়ারা একই পাহাড়ে ঘন ঘন জুম চাষ করছেন। এতে ক্রমেই কমছে জমির উর্বরতা; ব্যাহত হচ্ছে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বিকাশ। বিকল্প আয় না থাকায় হতদরিদ্র আদিবাসীরা জুমও ছাড়তে পারছেন না। আদিবাসীদের প্রকৃতিনির্ভর হাজার বছরের ঐতিহ্য জুম চাষের ওপর সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি এক গবেষণাপত্রে এ সব কথা বলা হয়েছে। ‘জুম চাষ : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়, এক দশক আগেও কোনো পাহাড়ে জুম চাষ করার পর ১০ থেকে ১৫ বছর সেখানে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হতো; রক্ষা পেত জমির উর্বরতা। কিন্তু ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধের কারণে প্রায় ৫৪ হাজার একর চাষের জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সংকুচিত হয় জুমের পাহাড়। আশির দশক থেকে পাহাড়ে অপরিকল্পিতভাবে বাঙালি অভিবাসন গড়ে ওঠায় পার্বত্যাঞ্চলের ওপর বাড়ছে জনসংখ্যার চাপ। এ ছাড়া বন বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনী অধিগ্রহণ করায় সংকুচিত হচ্ছে জুমের জমি। এমনিভাবে ক্রমেই চাষের পাহাড় কমতে থাকায় পার্বত্যাঞ্চলের প্রান্তিক চাষি জুমিয়ারা এখন বাধ্য হয়ে মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানে একই পাহাড়ে জুম চাষ করছেন। এতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমছে।  পার্বত্য চট্টগ্রাম, গারো ও খাসিয়া পাহাড়ের বাইরে ভারতের অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা ‘সেভেন সিস্টার্স’ খ্যাত এই সাতটি রাজ্যে জুম চাষ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এ ছাড়া চীন, নেপাল, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর রয়েছে জুমচাষের প্রাচীন ঐতিহ্য। পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসীদের নিজস্ব শাসনরীতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী কার্বারি (গ্রামপ্রধান) ও হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) জুমিয়াদের জন্য চাষাবাদের পাহাড় নির্দিষ্ট করেন। কষ্টকর এই চাষে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর তো বটেই এমনকি কখনো কখনো কয়েকটি গ্রামের জুমিয়ারা যৌথভাবে অংশ নেন। চাষের জন্য নির্বাচিত পাহাড়টির জঙ্গল ও আগাছা বিশেষ কৌশলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বলে বনাঞ্চলে এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে না। এ ছাড়া নিজেদের স্বার্থেই জুমিয়ারা বড় আকারের গাছের ক্ষতি করেন না। বৃষ্টির পর জুমের জমিতে ছোট ছোট গর্ত করে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, কলা, আনারস, তরমুজসহ কয়েক ধরনের প্রধান শস্যের সঙ্গে অন্যান্য ফসল ও শাকসবজি চাষ করা হয়। আবার সমতলের চেয়ে জুমের ফসলের বীজও ভিন্ন। সার ও কীটনাশকবিহীন এসব খাদ্য পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। জুম চাষ নিয়ে পাহাড়ি লোকগাঁথা, গান ও ছড়া, প্রবাদ প্রবচনও খুব সমৃদ্ধ। জুম পরিচর্যার অস্থায়ী আবাস ‘মোনঘর’ নিয়ে চাকমা জনপদে আছে নানা স্মৃতিকথা। গবেষণাপত্রটি তৈরিতে নেতৃত্ব দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার আন্দোলনের বান্দরবান কমিটির সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই। বম জনজাতির এই নেতার রয়েছে জুম চাষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষের এই বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ নানা দেশেই প্রচলিত। সে সব দেশের তুলনায় আমাদের দেশের পাহাড়গুলো অনেক উর্বর। আমাদের জুমিয়ারা হাজার বছর শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে ফলিয়ে আসছেন পুষ্টিকর ও সুস্বাদু বিভিন্ন ধরনের ফসল, শাকসবজি ও ফল-মূল। কিন্তু এখন নিতান্ত নিরুপায় হয়ে তাঁরা জুমের জমিতে ব্যবহার করছেন রাসায়নিক সার।’ রাঙামাটির বিশিষ্ট পরিবেশবিদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার আন্দোলনে সাধারণ সম্পাদক সুদত্ত বিকাশ তংচঙ্গা এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, জুম নিয়ে জনমনে তো বটেই, এমনকি সরকারি মহলেও রয়েছে নানা ভ্রান্ত ধারণা। এর মধ্যে জুমের আগুনে পাহাড়ের বনজ ও প্রাণিজ সম্পদ ধ্বংস, জুমের কারণে পাহাড়ের ভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি, জুম একটি পরিবেশবিরুদ্ধ অবৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি ইত্যাদি প্রচারণা প্রধান। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সন্তান জুমিয়ারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই জুমের আগুনে কখনো আগাছা বাদে কোনো বনজ বা প্রাণিজ সম্পদ নষ্ট করে না। জুমচাষে লাঙল বা কোদাল ব্যবহৃত হয় না বলে বলে ভূমি ক্ষয় হয় অনেক কম। এ ছাড়া বন বিভাগের পরিবেশবিরুদ্ধ মনো-কালচারের (একই ধরনের গাছের বাগানায়ন) বিপরীতে জুম একটি পরিবেশবান্ধব মাল্টিকালচার (বিভিন্ন ধরনের গাছের সমাবেশ) চাষপদ্ধতি।