‘দেশের ৮ বিভাগেই হবে ক্যান্সার হাসপাতাল’-স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশে ২৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আট বিভাগে ৮টি ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক। সেখানে ক্যানসারসহ হার্ট ও কিডনির চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান তিনি।বৃহস্পতিবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বিশ্ব ক্যানসার দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।ক্যানসার চিকিৎসা ব্যয়বহুল উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার জন্য এত লোক ঢাকায় আসে, দীর্ঘসময় রোগীসহ তাদের স্বজনদের ঢাকায় থাকতে হয়। চিকিৎসার জন্য অনেক সময় লাগে, এ চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। তাই হাসপাতালগুলো তৈরি হয়ে গেলে অন্য বিভাগের লোকদের কষ্ট করে ঢাকায় আসতে হবে না। আটটি হাসপাতালে প্রায় ১০০০ বেড হবে। এতে অনেকাংশে এ রোগের চিকিৎসা পেতে মানুষের কষ্ট দূর হবে। সেজন্য আমাদের চেষ্টা চলছে।
ক্যানসার সারা বিশ্বের জন্য দূরারোগ্য ব্যাধি। সারা বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটি মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশেও তার চিত্র ভালো নয়। প্রতিবছর এক লাখ মানুষ মারা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্যসেবায় পুরস্কৃত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ভ্যাকসিন হিরো।

জাহিদ মালেক বলেন, ভ্যাকসিন নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলা হচ্ছে। যারা গুজব ছড়ায় তারা দেশের মানুষের ভালো চায় না। এটা আমরা করতেও দেবো না। আমরা সারা বছর ভ্যাকসিন নেবো, করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

যারা দেশের মঙ্গল চায় না তারা বিদেশে বসে ষড়যন্ত্র করছে অভিযোগ করে মন্ত্রী বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা বিদেশে বসে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে ষড়যন্ত্র করছে। আমরা সজাগ আছি, কোনো ষড়যন্ত্রে কাজ হবে না। দেশের মানুষ সচেতন, মানুষ উন্নয়ন চায়। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।

জাহিদ মালেক বলেন, নন কমিউনিকেবল ডিজিজে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আট বিভাগে ক্যানসার হাসপাতাল করা হচ্ছে। যার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। হাসপাতাল তৈরি হলে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হবে না। চালু হলে আরো এক হাজার বেড যুক্ত হবে।

তিনি বলেন, করোনায় বহু লোক মারা যেত, যদি ভালো স্যানিটেশন ব্যবস্থা না হতো। এখন সংক্রমক রোগ কমছে, কিন্তু অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০টি আইসিউ বেড চালু হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট কম। জিডিপির ১ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হচ্ছে। পঞ্চম পরিকল্পনা বার্ষিকীতে ২ শতাংশ বাড়ানো হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ যেখানে করোনার ভ্যাকসিন আনতে পারেনি, সেখানে আমরা প্রথমেই আনতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে করোনা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভ্যাকসিন নিয়ে এসেছি, আপনারা করোনার ভ্যাকসিন নেবেন, তাহলে করোনা প্রতিরোধ করতে পারবো।

মন্ত্রী বলেন, সময়মতো চিকিৎসা নিলে বা রোগ নির্ণয় করলে সেরে ওঠা যায়। আদিকাল থেকে ক্যান্সার ছিল। আজ থেকে চার হাজার বছর আগেও ক্যানসারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। খাবারে রং মেশালে, মেদ বাড়লে, বাতাস দূষিত করলে ও ধূমপান করলেও চিকিৎসা হয়। যথাসময়ে রোগ নির্ণয় হলে নিরাময় লাভ করা যায়।

সরকারের মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের টিকা দেওয়ার জন্য মহাখালীর শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

জাহিদ মালেক বলেন, ৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম উদ্বোধন হবে। ঢাকায় প্রায় ৩০০টি স্থান থেকে টিকা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ বিভিন্ন শ্রেণির জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল ঠিক করে দিয়েছে। যারা কোর্টের লোকজন, তারা যেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকা দিতে পারেন। আবার সচিবরা আছেন, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আছেন… সেটাও ভাগ করে দেওয়া আছে। যাতে সুষ্ঠুভাবে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়, ভিড় না হয়। আমাদের কিছু মন্ত্রী, এমপিরা আছেন, ওঁদের আহ্বান করেছি যেন তারা যার যার এলাকায় টিকা নেন। এ ছাড়া তাদের জন্য গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল নির্ধারণ করেছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কোভ্যাক্সের আওতায় বাংলাদেশ যে টিকা পাবে, তার প্রথম চালান আগামী এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে পৌঁছাতে পারে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কোভেক্স থেকে ছয় কোটি ডোজের বেশি টিকা পাওয়া যাবে। সেটিও আমরা আশা করছি এপ্রিল-মে মাস থেকে কিছুকিছু পাব। সারা বছর জুড়েই পাব এবং দিতে থাকব। কাজেই কখন কত টিকা দিলাম সেই হিসাব এখনও দেওয়া ঠিক হবে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, অনেক দেশ না পারলেও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে টিকা নিয়ে এসেছে। এরইমধ্যে আনা ৭০ লাখ টিকা সব জেলায় পৌঁছে গেছে। টিকা নেওয়ার জন্য এরইমধ্যে দেড় লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। আগে নিবন্ধন একটু স্লো থাকলেও এখন তা বাড়ছে। আমি আজই জানতে পারলাম প্রায় দেড় লাখ লোক এরইমধ্যে নিবন্ধন করে ফেলেছে। ইদানীং নিবন্ধন খুব বাড়ছে। আমরা অনুরোধ করব, আপনারা করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে আমরা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, ক্যান্সার পৃথিবীতে সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাধি। প্রতিবছর ১৯ মিলিয়ন লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়। ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ক্যান্সার রোগী বাড়ছে, বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। ওষুধ রপ্তানি করে যে আয় হয়, এর চেয়ে বেশি অর্থ ক্যানসার চিকিৎসায় বিদেশে চলে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার খুরশীদ আলম বলেন, ক্যানসার নির্ণয়ে স্ক্রিনিং মেশিন বাড়ানো দরকার। ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, খাদ্যাভাস পরিবর্তন করতে হবে এবং সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. এম ইকবাল আর্সলান, মহাসচিব ডা. এমএ আজিজ ও আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা প্রমুখ।

এ সময় অনকোলজিস্ট ডা. রওশন আরা বেগম ক্যান্সার দিবসের প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া মন্ত্রী হাসপাতালের ব্র্যাকিথেরাপি ও সিটি সিমুলেটর মেশিন উদ্বোধন করেন এবং ক্যান্সার রোগীদের মাঝে শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন।