জীবন সংগ্রামের পথে যখন ক্যামেরা ক্লিকে জীবন চলে

ক্যপশানঃ জীবন সংগ্রামের পথে বয়সটা বারো কিংবা চৌদ্দ। হালকা-পাতলা দেহ গঠনের পেশা হিসাবে তুলে নিয়েছে উপার্জনের একমাত্র হাতিয়ার ক্যামেরা । শিশু কাল থেকে কিশোর ভাই বোন দুই জনেই রীতিমতো কুইক সার্ভিস বীচ ফটোগ্রাফার । ইনানি বীচ চষে বেরায় সারাক্ষণ । ভ্রমনকারিরা ভ্রমনে এসে ক্ষনিকের স্মৃতি তাঁদের এ্যালবামের স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার জন্য ছবি তোলেন এবং ক্ষুদে ফটোগ্রাফাররা সঠিক সময়ে যথাস্থানে বিশ্বস্ততার সাথে পৌঁছিয়ে দেয় । গলায় ঝুলানো ক্যামেরা নিয়ে দর্শনার্থীদের দিকে চেয়ে আছে। দর্শনার্থী দেখলেই বলছে, ‘ছবি তুলবেন। কেউ হয়তো সম্মতি জ্ঞাপন করে ছবি তুলছেন। কেউবা অসম্মতি জ্ঞাপন করে চলে যাচ্ছেন। যারা ছবি তুলছেন তাদের ছবিগুলো নিখুঁতভাবে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলেটি। যে জায়গাটিতে সুন্দর ছবি আসে ঠিক সেই জায়গাটিতে দর্শনার্থীটিকে নিয়ে যাচ্ছেন। কারণ ছবি যত ভালো আসবে, তার রোজগার তত বেশি হবে। ছেলেটির নাম তপন। বাড়িতে বাবা-মা ও এক বোন আছে। এ বয়সে তাকে ক্যামেরা চালিয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করতে হচ্ছে।
আমার ক্যামেরা দেখে ছেলেটির আগ্রহ হলো আমাকে শুট করবে আমিও রাজি হলাম ২ টি ছবি চল্লিশ টাকায় । তাদেরও শুট করলাম তাদের মত এক জন ফটোগ্রাফার হয়ে ।কথার ফাঁকে বললাম, তোমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না, অন্য দশজন ছেলের মতো খেলাধুলা করতে ইচ্ছে করে না? প্রথম দিকে না বলে দিলো, কিছুক্ষণ পরেই বললো, ‘যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু যেতে পারি না’। তার কাছে জানতে চাইলাম, ক্যামেরা চালিয়ে অন্যের ছবি তুলতে তোমার কেমন লাগে? ছেলেটি বললো, অনেক ভালো লাগে। এভাবেই সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে তপন বিদায় নিলো। কারণ তপনের যে ক্যামেরা চালাতে হবে। অন্যের আনন্দের স্মৃতিগুলোকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করে তাকে যে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। যুগে যুগে তারাই বেঁচে থাকবে আমাদের মত ফটোগ্রাফাররা আমাদের হয়ে । ক্ষনে ক্ষনে ক্যামেরার আকৃতি , প্রকৃতি, স্থান পাল্টাবে কিন্তু ছবি তোলার যন্ত্রটির একটি নাম CAMERA রয়ে যাবে । মোবাইল , ক্লোজ , স্টিল বা মোভি যাই বলেন না কেন সর্বদাই ক্যামেরা নামে উচ্চারিত হবে ।এরকম কয়েক শ কিশোর-তরুণকে ক্যামেরা হাতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, হিমছড়ি পাহাড়, চন্দ্রনাথ পাহাড় ও ইনানী সি-বিচে দেখতে পাওয়া যাবে। যারা সকাল হলেই ঘর থেকে ক্যামেরা হাতে বেড়িয়ে পড়ে। দিনভর পর্যটকদের স্মৃতির স্বাক্ষী হতে তারা ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। আনন্দদায়ক সৌকত ভ্রমণকে স্মৃতিময় করে রাখতে এরা ক্যামেরায় হাত চালায়। এদের মধ্যে অনেকেই পেশা হিসেবে এটাকে গ্রহণ করেছে। দর্শনার্থীদের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে তাদের রোজগার। যে সময়টিতে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি থাকে, সে সময়টিতে তাদের রোজগার বেশি হয়।এরা জীবিকার তাগিদে ক্যামেরা চালালেও সমুদ্র ও পাহাড়কে তারা ভালোবাসে। তার বেশ কয়েকটি দৃশ্য আমি দেখেছি। সমুদ্রের পানিতে কেউ ময়লা-আবর্জনা ফেললে তারা নিষেধ করছে। পাহাড়ের চূড়ায় পানির বোতল দেখলে তারা তা কুঁড়িয়ে নিদিষ্ট জায়গায় রেখে দিচ্ছে। কারণ সমুদ্র ও পাহাড় টিকে থাকলে, টিকে থাকবে তাদের জীবন। এদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ক্যামেরা চালানোর প্রশিক্ষণ হাতে-কলমে তারা কখনো নেননি। তবে বড় ভাই ও অন্যের দেখেই তারা ক্যামেরা চালানো শিখেছে।

ছবিঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু ১২-০২-২০২১ ।