কক্সবাজারে তিন দিনের ছুটিতে পর্যটকের ঢল

কক্সবাজারে করোনার ভয়কে উপেক্ষা করে তিন দিনের ছুটিতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। শহরের ৪৫০টির বেশি হোটেল, মোটেল ও কটেজের সব কক্ষই অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলে টানা তিনদিনের ছুটিতে কক্সবাজারে এসেছেন প্রায় ১০ লক্ষাধিক পর্যটক।তিল ধারণের ঠাঁই নেই বিশ্বের দীর্ঘতম এই সৈকতে। কক্ষ ভাড়া না পেয়ে অনেক পর্যটক সমুদ্রসৈকত ও সড়কে পায়চারি করে সময় পার করছেন কেউ কেউ।

শুক্রবার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে দেখা যায়, অর্ধ লাখ পর্যটক সৈকতে নেমে গোসল করছেন। আরও কয়েক হাজার বালুচরে দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত। কেউ দ্রুতগতির জেডস্কি ও স্পিডবোট নিয়ে নীলজলের বিশাল সমুদ্রে পাড়ি জমাচ্ছেন। আবার কেউ মুগ্ধ হচ্ছেন ছেলেমেয়েদের ঢেউয়ের তালে সার্ফিং দেখে। এ ছাড়া পর্যটকদের বিনোদনের জন্য সৈকতে বিচ বাইক, প্যারাসেইলিং, শিল্প ও বাণিজ্য মেলাসহ নানা আয়োজন তো আছেই।কক্সবাজারের সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ পর্যটকে পরিপূর্ণ। সমুদ্রসৈকতের লাবনী, সুগন্ধা, ইনানী, হিমছড়িসহ ছয়টি পয়েন্ট ছাড়াও দরিয়ানগর, হিমছড়ি ঝরনা, রামুর বৌদ্ধ বিহার, রেডিয়েন্ট ফিশ ওয়ার্ল্ড, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, দুলাজাহারা সাফারি পার্ক, সোনাদিয়া ও সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো পর্যটকে মুখর। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। সৈকতে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতেছেন পর্যটকরা। অনেক পর্যটক রাস্তায় ঘোরাঘুরি করছেন। রাস্তায় অন্যত্র রাত্রিযাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তাদের।

টেকনাফ থানা আঙিনায় স্থাপিত ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনির ‘মাথিন কূপ’দেখতে যাচ্ছেন হাজারো পর্যটক। সেখান থেকে তাঁরা ছুটছেন নাফ নদীর মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে সেন্ট মার্টিন। চারটি প্রমোদতরি (জাহাজ) ও ৩০টির বেশি ট্রলার নিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১২ হাজার পর্যটক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রবাল দ্বীপে আসছেন। সেখানকার ১২২টি হোটেল, মোটেল ও কটেজও বুকিং হয়ে গেছে।

সৈকতে উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থা ‘ইয়াছির লাইফ গার্ড স্টেশনের’পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘শুক্রবার সৈকতের চার-পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় সমবেত হয়েছিলেন লাখ লাখ পর্যটক। বিপুলসংখ্যক পর্যটক সামাল দিতে ২০ জন উদ্ধারকর্মীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

কক্সবাজার কটেজ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কাজী রাসেল আহমেদ বলেন, সৈকতের আশপাশের ২২০টি কটেজের কোনোটিই খালি নেই। একই তথ্য দিয়েছেন ‘কক্সবাজার হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের’সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত হোসেনও।

হোটেল মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতি নেতা ওমর সুলতান বলেন, শহরের ৪৫৩টি হোটেল মোটেল কটেজে দৈনিক থাকতে পারেন ৯৭ হাজারের মতো পর্যটক। এর অতিরিক্ত পর্যটক এলে হোটেলে গাদাগাদি করে রাখতে হয়। এরপরও অনেকে কক্ষ ভাড়া না পেয়ে বিপদে পড়েন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশের টিম। মোতায়েন রাখা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশও। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে পর্যটন স্পটগুলো। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত সাধারণ চিকিৎসা ও খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে সৈকতে।

কলাতলীর মোহাম্মদীয়া গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হোটেল-মোটেলে যে পরিমাণ ধারণ ক্ষমতা, তার চেয়ে লোকসমাগম অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে। রুম বুকিং করে যারা এসেছেন, তারা ছাড়া বাকিরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।’

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, ‘কক্সবাজারে প্রচুর লোকজন এসেছে। আমরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ রোধে চেষ্টা চালাচ্ছি। যে কোনো ধরনের হয়রানি রোধে জেলা প্রশাসনের দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত হোটেল-মোটেল জোনে টহলে রয়েছে।’

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘পর্যটক নিরাপত্তায় সৈকত ও আশপাশে পোশাকধারী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ রেসকিউ টিম, ইভটিজিং কন্ট্রোল টিম, ড্রিংকিং জোন, দ্রুত চিকিৎসাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তায়। সৈকতে বীচ বাইক নিয়েও রয়েছে টহল। রয়েছে ৩টি বেসরকারি লাইফ গার্ড সংস্থার অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী। কন্ট্রোল রুম, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসহ পুরো সৈকত পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছে।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের সেবা দিতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকে। সৈকতের লাবনী, সুগন্ধা, কলাতলীসহ ১১টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে তথ্যকেন্দ্র। পর্যটকদের করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সর্বদা সচেতনতামূলক মাইকিং ও প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।’

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময় সর্তকাবস্থায় রয়েছে পুলিশ। পর্যটকদের হয়রানি রোধে, পোষাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোষাকে এবং পর্যটক বেশেও পুলিশের নারী সদস্যরা সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’