কাবুলের বিমানবন্দরে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ১২ মার্কিন সেনাসহ নিহত ৬০

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের হামিদ কারজাই বিমানবন্দরের বাইরে জোড়া আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটেছে। সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতা জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুটি বড় ধরনের আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিবিসির খবরে ১২ মার্কিন সেনা সদস্যসহ ৬০জন নিহত হয়েছে । নিহতদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক ও শিশু বেশি। অন্যদিকে খবরে বলা হয়, বিস্ফোরণের সময় সেখানে অন্তত চারশো থেকে পাঁচশো লোক উপস্থিত ছিল। ফলে নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম খবরে হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়। আহত হন আরও অন্তত ১২০ জন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই আফগান নাগরিক। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকালে কাবুলে বিমানবন্দরের এবি গেটের বাইরে ভিড়ের মধ্যে প্রথম বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে শিশুও আছে। বিমানবন্দরের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা তালেবান যোদ্ধারাও বিস্ফোরণে আহত হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। পরে পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে ব্যারন হোটেলের কাছে আরেকটি বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ৪ মার্কিন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকসহ বহু নিহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
১১ দিন আগে তালেবানের হাতে কাবুলের পতন হওয়ার পর এই হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়েই ৮২ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদেশিদের পাশাপাশি আফগানরাও রয়েছেন তাদের মধ্যে। ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত সময়সীমার মধ্যে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তোড়জোড় করছে পশ্চিমা দেশগুলো। দেশ ছাড়ার চেষ্টায় হাজার হাজার আফগানও মরিয়া হয়ে বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে অপেক্ষা করছেন প্রতিদিন। এই নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস সেখানে হামলা চালাতে পারে বলে খবর আসছিল গত কয়েক দিন ধরেই।
কাবুল বিমানবন্দর সন্ত্রাসী হামলার ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলতে বলেছিল বুধবার। এই সতর্কবার্তার মধ্যেই যুক্তরাজ্যের আর্মড ফোর্সেস বিভাগের জুনিয়র মন্ত্রী জেমস হিপি বৃহস্পতিবার বিবিসি রেডিও ফোরকে বলেন, কাবুল বিমানবন্দরে মারাত্মক হামলার চেষ্টা হতে পারে বলে ‘খুবই বিশ্বাসযোগ্য‘ খবর আছে তার কাছে। তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেরকম কিছু ঘটতে পারে। এরপর আফগানিস্তানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি জন কিরবি জানান, কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অবহিত করা হয়েছে।
বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, তালেবান দাবি করছে, বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে বলে তালেবানের একজন কর্মকর্তা বলছেন। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে বিস্ফোরণে ‘বেশ কয়েকজন’ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। অমেরিকান মিডিয়া খবর দিচ্ছে চারজন মেরিন সেনা নিহত হয়েছে এবং আরও সৈন্য আহত হয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র বলছেন, নিহতদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকসহ বেশ কিছু বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। কাবুল থেকে বিবিসি সংবাদদাতা সেকান্দার কিরমানি জানান, বিস্ফোরণের পর যেসব ভিডিও এবং ছবি প্রকাশিত হয়েছে তাতে লাশের ওপর লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী এক সাংবাদিককে জানিয়েছেন, যে বোমাটি ফেটেছে তা ছিল ‘খুবই শক্তিশালী’।
রয়টার্স বার্তা সংস্থা একটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে তাতে এই ব্যক্তি বলছেন, বিস্ফোরণের সময় সেখানে অন্তত চারশো থেকে পাঁচশো লোক উপস্থিত ছিল। বিলাল সারওয়ারি নামের একজন আফগান সাংবাদিক প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এক টুইটে বলেছেন, বিমানবন্দরের এবি গেটের বাইরে কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য দিয়ে একটি নালার পাশে অপেক্ষা করছিলেন বহু আফগান। তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশুও ছিল। সেখানেই ভিড়ের মধ্যে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায় একজন অন্তত আরও একজন সেখানে গুলি চালায়। আফগানিস্তানের টোলো নিউজের খবরেও ভিড়ের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটানোর কথা বলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন অ্যায়ের্স অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্যাটেজি কমিটির সদস্য অ্যালিসিয়া কেয়ার্নস বলেছেন, ব্যারন হোটেলের বাইরে বিস্ফোরণের ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের পাশাপাশি আফগানদের মধ্যে কাদের সরিয়ে নেওয়া হবে, তা বাছাইয়ের কাজ চলছে ওই হোটেলে। এই কনজারভেটিভ এমপি এক টুইটে জানিয়েছেন, ওই হোটেলের উত্তর গেটের কাছে বোমা হামলার পাশাপাশি গুলিও চালানো হয়েছে। টোলো নিউজের এক টুইটে দেখা যায়, ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মানুষজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছু ভিডিওতে দেখা যায় রক্ত আর লাশ, আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানুষের জুতা, ব্যাগ আর বিভিন্ন জিনিসপত্র। সিএনএস জানিয়েছে, বিস্ফোরণের খবর যখন এল, প্রেসিডেন্ট বাইডেন তখন হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে আফগানিস্তানের ওপর প্রতিদিনের ব্রিফিং শুনছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনও ছিলেন তার সঙ্গে। কাবুলে বিস্ফোরণের খবর আসার পরপরই জরুরি বেঠক ডেকেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, পরিস্থিতি হয়তো এমন দাঁড়াতে পারে যে কোনো কিছুই আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।