সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করলে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ হবে

সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করলে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ হবে- ড. অনুপম সেন

বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) বেলা ১২টায় নগরীর নন্দনকানন চত্বরে এ মহাসমাবেশের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন), চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি।
বরেণ্য সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করলে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধ হবে।তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৭২’র সংবিধান ফিরিয়ে আনতে হবে। সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে। সারাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মঠ-মন্দিরে হামলা করে প্রতিমা ভাংচুর, বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ইসকন নোয়াখালী মন্দিরে সাধু-সন্ন্যাসীদের হত্যাসহ দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উত্তরণে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার সমাবেশ।

মহাসমাবেশে সকাল থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলে দলে সনাতনীরা সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। দুপুর ১২ টায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মুল অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। এরপর বৈদিক স্বস্তিবাচনের পরপরই স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইস্কন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ শ্রীপাদ লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারী এবং দিক নির্দেশনামূলক ও দাবি সম্বলিত বক্তব্য রাখেন ইসকন চট্টগ্রামের বিভাগীয় সম্পাদক শ্রীপাদ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী।

মহাসমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে উপস্থিত ছিলেন শংকর মঠ ও মিশনের আচার্য শ্রীমৎ তপনানন্দ গিরি মহারাজ, শ্রী শ্রী তুলসীধামের মোহন্ত মহারাজ, শ্রীমৎ দেবদ্বীপ মিত্র পুরী মহারাজ, চট্টগ্রাম বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ ড. জিন বোধি ভিক্ষু, পাথরঘাটা ক্যাথলিক চার্চের ফাদার মিস্টার লেনার্ড।

সমাবেশে সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, অসাম্প্রদায়িক দেশে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় আপনাদের মতো আমিও ব্যথিত। জননেত্রী শেখ হাসিনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। যেখানে সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেখানে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মানুষের দুঃখের কথা শুনেছেন এবং ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। চট্টগ্রামেও যেখানে ঘটনা ঘটেছে, আমি নিজে ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছি। আপনাদের ক্ষোভ আমি বুঝি, আপনাদের দুঃখ কষ্ট আমি বুঝি। আমি আপনাদের সঙ্গে আগেও ছিলাম, এখনো আছি, ভবিষ্যতেও থাকবো।

এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতারা একটি কথা বলতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি আছে, তা পৃথিবীর কোনো জায়গায় নেই। আমি বলব সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকরণ করে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ভাগ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট করেছে। আমরা সরকারি দলের মধ্যে একটা আত্মশুদ্ধি চাই। এ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর ৭১ এর আওয়ামী লীগ কিনা আমরা জানি না। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে আওয়ামীলীগ ক্রমশ ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে। ওই আওয়ামী মুসলিম লীগ দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নাই। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদদের ওপর আমাদের আস্থা নাই। আগামী দেড় দুই বছর আমরা ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘুদের নানাবিধ সংগঠন যুক্তভাবে আমরা মাঠে থাকব। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। সময় আছে দেড় বছর। আমরা মাঠে আছি, মাঠে থাকব। মাঠ ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাব না।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সকল ধর্মের সকল জাতি সত্বার সমন্বয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ সুখী বাংলাদেশ। এ জন্য তিনি তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি এটি আমাদের মাতৃভূমি হলেও একদিন হয়ত আমরা এদেশে নিশ্চিন্ন হয়ে যাব। বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা এখনো অটুট। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমুহের প্রতি আমাদের আস্থা আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। আমরা চাই, সকল সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে বিচার হোক, ক্ষতিগ্রস্থ মঠ-মন্দির রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পুননির্মান হোক ও সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হোক। এছাড়া সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় জড়িত ও উসকানিদের শাস্তি ফাঁসি করার দাবি জানান বক্তারা।বিএনপির মহানগর সভাপতি ডা.শাহাদাত হোসেন বলেন, বিএনপি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। হামলার ঘটনায় যারা প্রকৃত জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরাপরাধ কাউকে যেন গ্রেপ্তার করা না হয় বা ঘটনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেরা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। আসুন সকলে মিলে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

ইসকন সদস্য স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী ও সাংবাদিক বিপ্লব পার্থের সঞ্চালনায় মহাসমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন এমপি, মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এমএ সালাম, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এড. রানা দাশগুপ্ত, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র মহানগর সভাপতি ডা.শাহাদাত হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)র ইন্দু নন্দন দত্ত, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ পালিত, ইসকন কো-রিজিওনাল সেক্রেটারি শ্রীপাদ রাধা গোবিন্দ দাস ব্রহ্মচারী, বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা এড. তপন কান্তি দাশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী, পুলক খাস্তগীর, শৈবাল দাশ সুমন, নীলু নাগ, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক চন্দন তালুকদার, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুজিত কুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ ভট্টাচার্য, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, ইস্কন নন্দনকানন মন্দিরের অধ্যক্ষ শ্রীপাদ পন্ডিত গদাধর দাস ব্রহ্মচারী প্রমুখ
purbokne