বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ কেমন ছিল তেজগাঁও বিমানবন্দর?

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ কেমন ছিল তেজগাঁও বিমানবন্দর?

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডন ও দিল্লি হয়ে প্রাণের শহর ঢাকা ফিরে আসেন বেলা ১টা ৪১ মিনিটে। ঢাকা অবতরণের পূর্বে কমেট বিমানটি বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাবশত প্রায় ৪৫ মিনিট বিমানবন্দরের ওপর চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। ওপর থেকে “সোনার বাংলা” অবলোকন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর এ ফেরা শুধু ফেরা ছিল না-এ ফেরা বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামী ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত। কোনো মুক্তিসংগ্রাম যেকোনো দিন ব্যর্থ হতে পারে না এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধে ন্যায়ের বিজয় যে অবশ্যম্ভাবী-অত্যাচারী ও অপহরণহারীদের কবল থেকে ২৯১ দিন পর সন্তান মাঝে জাতির পিতার এই প্রত্যাবর্তন তারই উজ্জ্বল স্বাক্ষর। মুজিব তো শুধু বঙ্গবন্ধু নন, মুজিব তো শুধু জাতির পিতা নন, মুজিব তো শুধু রাষ্ট্রনায়ক নন মুজিব বাংলার প্রাণ, মুজিব বাঙালির প্রাণ। তাই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে হানাদার বাহিনী যখন শেখ মুজিবকে অপহরণ করে দেশান্তরে নিয়ে গিয়েছিল, তখন বাংলা ছিল, বাঙালি ছিল কিন্তু প্রাণশক্তি ছিল স্তব্ধ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিকেল ১টা ৪১ মিনিটে বাংলা ও বাঙালির সেই অপহৃত প্রাণশক্তি ফিরে আসে। একটি জাতির সমগ্র জনগোষ্ঠী তাদের একজন মাত্র মানুষ বা নেতার জন্য এমন উদগ্রীব, উৎকণ্ঠা আর প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষায় প্রহর গুনতে পারে তার উদাহরণ পৃথিবীর দ্বিতীয়টি নেই। এ যেন একেবারে সহজাত বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজন প্রবাসী পিতার জন্য সন্তানেরা যেমন অপেক্ষা করে, ঠিক তেমন। তাকে শুধু একনজর দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে জমায়েত হয়েছিল। এ দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে দৈনিক বাংলা লিখেছে:
“রুপোলী ডানার মুক্ত বাংলাদেশের রদ্দুর। জনসমুদ্রে উল্লাসের গর্জন। বিরামহীন করতালি, শ্লোগান আর শ্লোগান। আকাশে আন্দোলিত হচ্ছে যেন এক ঝাঁক পাখি। উন্মুক্ত আগ্রহের মুহূর্তের দুরন্ত আবেগে ছুটে চলেছে। আর তর সইছে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসেছেন রক্তস্নাত বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরীতে দখলদার শক্তির কারা প্রাচীর পেরিয়ে। …আমার সোনার বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের নয়নমণি, হৃদয়ের রক্তগোলাপ শেখ মুজিবুর এসে দাঁড়ালেন। আমাদের প্রত্যয় আমাদের সংগ্রাম, শৌর্য, বিজয় আর শপথের প্রতীক বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তাঁর স্বজনের মাঝে। চারধারে উল্লাস, করতালি, আকাশে নিক্ষিপ্ত বদ্ধ-মুঠি, আনন্দে পাগল হয়ে যাওয়া পরিবেশ-যা অভূতপূর্ব, শুধু অভূতপূর্ব।
এই প্রাণাবেগ অবর্ণনীয়।” … (দৈনিক বাংলা, ১১ জানুয়ারি ১৯৭২)। ১০ জানুয়ারি (১৯৭২) ভোরের আলো ফুটবার আগে থেকেই লোক জড়ো হতে শুরু করে বিমানবন্দরের আশেপাশে। বেলা ১১.৩০ মিনিট হয়নি কিন্তু বিমানবন্দর তখন উৎসব সাজে সজ্জিত হয়ে গেছে। জনতার আনন্দের কলস্বরে। তাই বেলা ১টা ৪১ মিনিট নাগাদ যখন জাতির পিতার দীর্ঘ ঋজু দেহ কালো ফুল প্যান্ট ও লম্বা হাতা মুজিব কোট পরিহিত অবস্থায় কমেট বিমানের সিড়ির ওপর এসে দাঁড়ান তখন উপস্থিত জনতার সংযমের বাঁধ ভেঙে যায়। নিকট থেকে দেখার জন্য কেবল উপস্থিত বাঙালিই নয়, বিমানবন্দরে উপস্থিত ভারতীয় সেনারাও এক ছুটে বিমান থেকে নামার সিঁড়ি ঘিরে ফেলে। লাখ লাখ বাঙালি বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে বিজয়সূচক স্বাগত জানায়। জনতা “জয় বাংলা” ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত করে তোলে। এরই মধ্যে তোফায়েল আহমেদ জাতির জনককে মাল্যভূষিত করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, আইনমন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক আহমদ সিড়িতে যখন নেতার সঙ্গে মিলিত হন তখন নেতার সংযমের বাঁধ ভেঙে যায় এবং অনুভূতি গোপন করার চেষ্টা না করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্লেনের সিড়িতে থাকতেই বঙ্গবন্ধু ফুলের মালায় ডুবে যান। তবে বঙ্গবন্ধু যখন বিমানের সিঁড়ির ওপর এসে দাঁড়ান তখন তাঁর মুখ মলিন এবং তাঁকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সর্বক্ষণের সহচর সেই পাইপটি হাতে ছিল না। হানাদার বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হবার পর দীর্ঘ নিঃসঙ্গ কারাবাস ও দীর্ঘ বিমানযাত্রার প্রতিক্রিয়া যে জাতির জনকের দেহের ওপর পড়েছে তা প্রথম দর্শনেই সকলের বোধগম্য ছিল। বাংলাদেশ সময় ১টা ৫১ মিনিটে ভিড়ের মধ্যে বিমানের সিঁড়ি বেয়ে জাতির জনক তার স্বপ্ন সোনার বাংলার মাটিতে পদার্পণ করেন। সাথে সাথে ৩১ বার তোপধ্বনি করে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সিঁড়ি থেকে নেমে আসার সাথে সাথে চারদিকে জাতির জনকের ওপর পুষ্পবৃষ্টি হতে থাকে। ভিড় ঠেলে মঞ্চে যেতে ৮ মিনিট সময় লাগে। প্রিয়জনকে একেবারে ঘিরে ধরেছিল উত্তাল জনতা। বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করেন। মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন। এ সময় বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী, লে. কর্নেল সফিউল্লাহ এবং বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামাল জাতির জনকের পাশে ছিলেন। মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী গার্ড অব অনার পরিচালনা করেন। মঞ্চে জাতির জনককে মাল্যভূষিত করা হয় এবং তাকে মাল্যদান করেন ভারতীয় সংসদ সদস্য সমর গুহ।
গার্ড অব অনারের পর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর যে অফিসারদের বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় তারা হলেন, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লে. কর্নেল এম.এ. রব, ডেপুটি চিফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকার, উইং কমান্ডার বাশার, সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল সি.আর. দত্ত, কমান্ডার লে, কর্নেল কে.এম সফিউল্লাহ, সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল মীর শওকত আলী, সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল খালেদ মোশাররফ, সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল এম.এ মঞ্জুর, অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব স্টাফ মেজর এ.আর, চৌধুরী, মেজর জিয়াউদ্দিন, মেজর জামান, মেজর মতিন, মেজর মালেক, স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ, মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন গাফফার ও সেক্টর এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডারবৃন্দ।
এরপর বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ঢাকাস্থ বিদেশি মিশনের সদস্যবৃন্দ ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে দেখা করেন। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিমানবন্দরে মিত্র বাহিনীর পদস্থ সামরিক অফিসার, বাংলাদেশ সরকারের পদস্থ কর্মচারী, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, ব্রিটেন, ফ্রান্স, বার্মা, নেপাল, পোল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, যুগোস্লাভিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া মিশনের সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিংহ, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, আবদুস সালাম এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের এ. হালিম ও মতিয়া চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর ও ঢাকার আর্চ বিশপ মি.গাঙ্গুলী। এছাড়াও শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ প্রমুখ ছাত্র নেতৃবৃন্দ বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন তারাও বঙ্গবন্ধুকে মাল্যদান করেন। বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন দেশে ছাত্রনেতাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।
বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতাকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেয়ার জন্য বিমানবন্দর লাখো জনতার উত্তাল তরঙ্গে দোলায়িত হয়েছিল। শ্রমিক, কৃষক, মজুরসহ জীবনের প্রতি স্তরের জনতার মাঝে ভারতীয় এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বহু সদস্য, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বাংলাদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রধান বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান।
উপস্থিত গণ্যমান্যদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিশিষ্ট সদস্য মি. জন স্টোন হাউজ, ভারতীয় পার্লামেন্ট সদস্য সমর গুহ, সোস্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল মি. হ্যানস জেনিসেফ, ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর মানবিক ত্রাণ সংস্থার চেয়ারম্যান মি. ডোনান্ড চেসওয়ার্থ, সোভিয়েত ইউনিয়নের কনসাল জেনারেল মি. ভ্যলস্টিন পোপভ, ব্রিটিশ হাইকমিশনের মি. আর. জি ব্রিটেন এবং মি. মিডোরফট, ফ্রান্সের কনসাল জেনারেল মি. পিয়ারি বারখোলে, ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের জয়েন্ট সেক্রেটারী সি.এ.কে রায়, ভারতীয় সেনাবাহিনীর এস.কে. গঙ্গোপাধ্যায়, মেজর জেনারেল গোনাল ভিস এবং মেজর জেনারেল সরকার প্রমুখ।
অভ্যর্থনা সমাবেশে অনেক কূটনীতিক আসলেও চীন ও ইরানের কনসাল জেনারেলদ্বয় অনুপস্থিত ছিলেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল হার্বার্ট, ডি, স্পিভাক এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে করমর্দন করার সময় সৌজন্য প্রকাশের জন্য সামান্য অবনত হন এবং বলেন “ঢাকায় স্বাগতম”। বঙ্গবন্ধু হেসে উত্তর দেন, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ”।
বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান বিমানবন্দরে এসেছিলেন তার খোকাকে দেখার জন্য। তিনি বিমান থেকে অবতরণের সিঁড়ির কাছে একটি গাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন। শেখ মুজিবকে তখন তিনি মাত্র এক নজরই দেখেছেন। পিতা-পুত্রের কোনো কথা হয়নি-হয়নি তাদের চার চোখের মিলনও। কেননা শেখ মুজিব বিমান থেকে নেমেই নিজের কর্তব্য সমাধান করতে গেছেন। বৃদ্ধ পিতা তাই তাঁকে আর ডাকেননি। আর সেই মুহূর্তে পুত্রের সাক্ষাৎ না হওয়ায় কোনো আক্ষেপও প্রকাশ করলেন না। উপস্থিত এক সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর পিতাকে প্রশ্ন করলেন, “আপনার পুত্র আর আমাদের জাতির পিতা এসেছেন। আপনি এখন কী ভাবছেন?” জবাবে শেখ লুৎফর রহমান বললেন, “ভাবছি—যিনি এত কিছু করতে পারেন—সেই আল্লাহকে। আল্লাহ আর বাংলাদেশের মানুষ আমার খোকাকে বড় করেছেন-আমি শোকর করছি। আমি দোয়া করি আল্লাহ খোকাকে আর তোমাদের সবাইকে হায়াত-দারাজ করুন। ওর আর তোমাদের এখন অনেক কাজ। তোমরা সবাই মিলে এবার নতুন করে গড়ে তোল সোনার বাংলাকে।” (দৈনিক পূর্বদেশ, ১১ জানুয়ারি, ১৯৭২)
সংবাদ সংগ্রহের জন্য বিমানবন্দরে তিন শতাধিক বিদেশি সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাতের পর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় উপস্থিত হবার জন্য খোলা ট্রাকে ওঠেন। ট্রাকে বঙ্গবন্ধুর সাথে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, এ. এইচ, এম কামরুজ্জামান, আব্দুল আজিজ, আবদুস সামাদ আজাদ, মনসুর আলী, ফণীভূষণ মজুমদার প্রমুখ মন্ত্রী, কর্নেল ওসমানী, ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, আ.স.ম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্যান্য আরও আওয়ামী লীগ ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ রেসকোর্সের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ১৭ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু হলে রাস্তায় দুধারে লাখো মানুষের মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে এগোনো সহজ কাজ ছিল না। তাই অতি মন্থর গতিতে এগোতে লাগল গাড়ির সারি। ইতোমধ্যে একটা গুজব ছড়িয়ে গিয়েছিল যে, বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্সে আসবার পথে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চেষ্টা করা হতে পারে। একে যথেষ্ট গুরুত্ব দেবারও দরকার ছিল, কেননা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস-এর ধর্মোন্মত্ত পাকিস্তানি বহু এজেন্ট তখনো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। নিরাপত্তা বিভাগের পরামর্শ ছিল বঙ্গবন্ধুকে আর্মড কারে অথবা সম্ভব হলে ট্যাংকে করে এয়ারপোর্ট থেকে রেসকোর্স ময়দা নিয়ে আসার জন্য। ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মীরা দ্রুত মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিল যে, এ দায়িত্ব নিরাপত্তা বাহিনীর চেয়ে তাদেরই বেশি। অস্থায়ী সরকারের সাথে আলোচনা করে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব তারা নিল। বিভিন্নভাবে তারা অবস্থান নিয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ, কম গুরুত্বপূর্ণ নির্বিশেষে সবগুলো জায়গাতে গিয়ে এবং জনতার সঙ্গে মিশে তাঁরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল।
তেজগাঁও বিমাবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত গমনপথে খোলা ট্রাকের ওপরে সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু আর রাস্তার দুধারে তাকে এক নজর দেখার প্রতীক্ষায় অধীর লাখো নর-নারী। রাস্তার দুপাশে লক্ষাধিক জনতা তাকে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু বলে স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানায়। সুদৃশ্য তোরণ ও বাংলাদেশের পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দিয়ে সজ্জিত রাজপথের জনসমুদ্র পাড়ি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে রেসকোর্স ময়দানে পৌছতে দীর্ঘ সময় লাগে। বেলা ২.৩১ মিনিটে বঙ্গবন্ধুর ট্রাক এসে পৌছায় এমপিএ হাউজ পর্যন্ত, ফার্মগেট ও শেরেবাংলা নগর ক্রসিং সময় বেলা তিনটা। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল বেলা ৩.৪২ মিনিট। রেসকোর্স ময়দান বেলা ৪.২৫ মিনিট। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত মাত্র ৫ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। সেদিন তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির বিষয়টি পত্রপত্রিকার সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত বিবরণ দেয়া হয়:
“চারদিকে অভূতপূর্ব প্রাণবন্যা। লোকজন বলতে গেলে পাগল হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্যে। তারা শ্লোগান দিচ্ছে, তারা নাচছে, তারা হাত তুলে বঙ্গবন্ধুকে জানাচ্ছে অভিনন্দন। তারা ফুলের মালা, ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে দিচ্ছে। মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার। এই হেলিকপ্টার থেকে চিত্রগ্রহণ করছে বাংলাদেশ সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগের চিত্রগ্রাহকরা। রাস্তার দুপাশের ফুটপাতে, আইল্যান্ডে, গাছের ডালে, বাড়ীর বারান্দায় ও ছাদে, দেয়ালের উপর, ট্রাফিক ল্যাম্প পোস্টের উপর সবখানে লোক। এমনটি আগে আর দেখেনি কেউ। অথচ কি আশ্চর্য শৃঙ্খলা। বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিকগণ আবেগে আত্মহারা অথচ শৃঙ্খলা দৃঢ়। রাস্তার পাশে আমি একজন বৃদ্ধকে দেখতে পাচ্ছি। বয়স কম করে হলেও ৯০ বছর। সাথে একজন বৃদ্ধা মহিলা। আশে পাশে দারুন ভীড়। বৃদ্ধা বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য চেষ্টা করছেন। একটি তরুণ বৃদ্ধাকে কোলে করে উপরে তুলে ধরলেন। দেখলাম বৃদ্ধা আঁচল থেকে একটি ফুল ছুঁড়ে দিলেন। বেলা ২.৩১ মিনিট। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ট্রাক এসেছে মাত্র এমপিএ হাউজ পর্যন্ত। পাশে যেই ঢিবির উপর ছিল হানাদার পাক বাহিনীর বিমান বিধ্বংসী কামান সেখানে দেখতে পেলাম বিজয়ী বাঙালির ভীড়। ছোট ছোট কতগুলো মেয়ে রাস্তার পাশে তালে তালে বাঁশি বাজাচ্ছে। পাশে কতকগুলো ছোট ছেলে দেখাচ্ছে কাঠি নৃত্য। রাস্তার দুপাশে অসংখ্য ফেস্টুন। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য পোস্টার। পোস্টারে ফেস্টুনে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে বঙ্গপিতাকে। সবাই হাত তুলে পোস্টার আন্দোলন করে জানাচ্ছে অভিবাদন। এয়ারপোর্ট থেকে যখন আমরা রওয়ানা হই তখন বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে জনতার অভিবাদন গ্রহণ করছিলেন। খানিক দূরে আসার পর ক্লান্ত বঙ্গবন্ধু তাঁর আসনে বসে পড়েন। তিনি তার আসনে বসেই জনতার অভিবাদনের জবাব দেন। তিনি ক্লান্ত তবু মুখের সেই হাসিটুকু যায়নি। খানিকদূর পর আবার তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আবার বসে পড়লেন। এগিয়ে চলছেন বঙ্গবন্ধু পেছনে আর দুপাশে জনসমুদ্র। আমি দেখতে পাচ্ছি জনতাকে অভিনন্দন জানাবার ফাঁকে ফাঁকে তিনি সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দীন আহমদের সাথে কথা বলছেন। বহুলোক আগে থেকেই রেসকোর্সে গিয়ে জমায়েত হয়েছেন। আর এদিকে রাস্তায়ও জনসমুদ্র। বঙ্গবন্ধুর ট্রাককে অত্যন্ত ধীর গতিতে এগুতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে লোকজন ট্রাকের গায়ের উপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে চলছে ট্রাক। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জনগণ আচরণ করছে। ভীড় আছে কিন্তু হুল্লোড় নেই। বাংলাদেশ বাহিনী, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও রক্ষী বাহিনীর লোকেরা তার নিয়ন্ত্রণ করছে।
জনগণই তাদের দিচ্ছে সহযোগিতা। শ্লোগান আর শ্লোগান। একটি লোক শ্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় পড়ে গেল। বোধ হয় অচেতন হয়ে গেছে। তাকে ধরাধরি করে সবাই সরিয়ে নিচ্ছে। শ্লোগান আর শ্লোগান। তালে তালে করতালি।… একটি ছেলে একটি ছোট্ট বাচ্চাকে ঘাড়ের উপর তুলে ধরেছে। বাচ্চাটি হাত নাড়াচ্ছে। কোনদিকে বঙ্গবন্ধু? ঐ ঐ দেখা যাচ্ছে। হাত দিয়ে দেখাচ্ছে যেন ঈদের চাদ খুঁজেছিল এতক্ষণ। ফার্মগেট ও শেরে বাংলা নগর ক্রসিং। সময় বেলা তিনটা। একজন বৃদ্ধা মহিলা দুহাত তুলে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু তার দিকে চেয়ে থাকলেন শ্রদ্ধায়। দুটি লোক গাঁদা ফুলের মালা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এদের একজনের পরনে লুঙ্গী, ছেঁড়া গেঞ্জী। অপর লোকটির পরনে পাজামা পাঞ্জাবী। একসাথে অনেকগুলো পোস্টার তাতে লেখা আছে—তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, যুদ্ধ আমরা লড়েছি বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, বঙ্গপিতা বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ-রুশ মৈত্রী অমর হোক, জয় বাংলা জয়। একজন বৃদ্ধ অদ্ভুত সুন্দর এক ফেস্টুন বানিয়ে নিয়েছেন। গামছার উপর সেঁটে দেয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর একটি প্রতিকৃতি। গামছাটি একটি লাঠিতে লটকানো। তাতে আরো রয়েছে ফুলের মালা। ব্যান্ডের তালে তালে নাচছে লোকজন। একদল মস্তান যারা ঢাকায় শিকল শাহ বলে পরিচিত তালে তালে নাচতে নাচতে এগিয়ে যাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের ফুটপাথে একদল বিত্তহীন শ্রেণীর মেয়েলোক। কারো কারো কোলে দুগ্ধপোষ্য শিশু। তাদের পাশেই সানগ্লাস পরিহিতা একজন মহিলা। আরো এগিয়ে এসে দেখতে পেলাম করতালি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানাচ্ছে একদল গেরিলা। তারা ফুলের মালা ছুড়ে দিচ্ছে। পথে পথে তোরণ আর তোরণ। কুলা, পাখা, সরা ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। আরো রয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। নানা ধরনের অসংখ্য ফেস্টুন।… একজন রিকশাওয়ালাকে দেখতে পেলাম চট করে তার গায়ের জামা খুলে আকাশে দোলাচ্ছে। এত আনন্দ। মনে হয় এত আনন্দ বোধ হয় আর কোনদিন ঈদে বা পূজায়ও হয়নি। এই আনন্দ হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করার মতো। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। সময় তিনটা বেজে বিয়াল্লিশ মিনিট। একজন পৌঢ় ট্রাফিক ল্যাম্প পোস্টের উপর তিনি উঠে বসেছেন। বঙ্গবন্ধুর ট্রাক ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে। বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রের ছাদ থেকে কেন্দ্রের কর্মীরা শ্লোগান দিচ্ছেন। রাস্তার দুপাশে আন্দোলিত হাত আর হাত। মনে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ পাখি যেন আকাশে উড়ছে। চারটা বেজে দশ মিনিট। বঙ্গবন্ধুর ট্রাক এসময় ঢাকা ক্লাবের সামনে।
ওপাশে রেসকোর্সে লক্ষ লক্ষ উন্মুখ জনতা। উল্লাসে ফেটে পড়ছে রমনা। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে প্রবেশ করছেন লক্ষ লক্ষ লোকের উল্লাসধ্বনি আর করতালির মধ্য দিয়ে। বিকেল ৪টা ২৫ মিনিট।”
নেতা রেসকোর্স পৌছলেন, লাখো লাখো প্রতীক্ষমাণ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার করতালিতে আকাশ-বাতাস হলো মুখরিত, জয় ধ্বনি ডুবিয়ে দিল সবকিছুকে। নেতা এগুলেন মঞ্চের দিকে, চারদিক থেকে শুরু হলো পুষ্পবৃষ্টি।
সূত্রঃ সজীব কুমার বনিক রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ বই থেকে নির্বাচিত অংশ #10January1972