অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জন্মবার্ষিকী

অগ্নিযুগের বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জন্মবার্ষিকী

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন-অগ্নিযুগের বিপ্লবী-মাস্টারদা সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ সহচর বিনোদ বিহারী চৌধুরীর ১১১তম জন্মদিন আজ।
আজীবন তিনি ছিলেন সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব, সদা সত্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়নিষ্ঠ এবং বিবেকের ণ্ড সব মিলিয়ে এক মহৎ মানুষ, চির বিপ্লবী। তাঁর নামের সঙ্গে ‘বিপ্লবী’ বিশেষণটা একাকার হয়ে গিয়েছিল। নিতান্ত সাদামাটা জীবনযাপন করেও কীভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠা যায় তারই এক বিরল দৃষ্টান্ত বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী।২০০০ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক স্বাধীনতা পদকসহ নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এ বিপ্লবী নানা সময়ে রাজপথে থেকে এ সমাজের পথপ্রদর্শক হিসেবে পথ দেখিয়েছেন।
বিনোদ বিহারীর জন্ম ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে।বোয়ালখালীর উত্তরভূর্ষি গ্রামের আইনজীবী কামিনী কুমার চৌধুরী ও রমারানী চৌধুরীর পঞ্চম সন্তান বিনোদ বিহারী১৯২৯ সালে সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করেন।
লাভ করেন রায় বাহাদুর বৃত্তি। স্কুল জীবনেই বিপ্লবী যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত হন। এসময় তিনি সংস্পর্শে আসেন মাস্টারদা সূর্য সেনের এবং সূর্যসেনের নেতৃত্বে বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে মাস্টারদার বিপ্লবী বাহিনি ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনির মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে অনেক বীর বিপ্লবী শহীদ হন। বিনোদ বিহারীর কণ্ঠনালীতে গুলি লাগে। গোপনে তাঁকে চিকিৎসা নিতে হয়। ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক, বিএ, এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাস করেন তিনি
ইংরেজ সরকার কর্তৃক গৃহবন্দী অবস্থায় ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ ও বি.এল পাস করেন। সে বছর গৃহবন্দীত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘পাঞ্চজন্য’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী অথচ অত্যন্ত সংযমী-প্রতিবাদী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ১৯৪৬ সালে চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমল মিলিয়ে তিনি কমপক্ষে ৭ বছর বিভিন্ন মেয়াদে জেল খেটেছেন, অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখেননি।
আজীবন তিনি সংসার-জীবনের ব্যয় নির্বাহ করেছেন ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে। ১৯৪১ সালে আবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। মুক্তি পান ৪৫ এর শেষ দিকে। বন্দী থাকাকালীন বিনোদ বিহারী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ৪৬ এ মুক্তি পেয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
ইংরেজি বাংলা উভয় ভাষাতেই অত্যন্ত দক্ষ এ বিপ্লবীর কাছে চট্টগ্রামের অনেক মানুষই তাদের শিক্ষাজীবনের পাঠ নিয়েছেন, যারা এখন দেশে-বিদেশে নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত। সাতচল্লিশে দেশ ভাগ ও একাত্তরের স্বাধীনতার পর সা¤প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বিভিন্ন কারণে ধর্মীয় সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের অনেকেই দেশ ছাড়লেও বিনোদ চৌধুরীকে টলাতে পারেনি কোনো কিছুই। নানা প্রতিক‚ল অবস্থার মধ্য দিয়েও তিনি টিকেছিলেন স্বদেশের প্রতি মমত্ববোধ, প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি নিবেদিত প্রতিশ্রুতির কারণে। আর তাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০১৩ সালে ১০ এপ্রিল তার জীবনাবসান ঘটলেও তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী চট্টগ্রামের মাটিতেই নিয়ে আসা হয়েছিল এই বীরের প্রাণহীন দেহ। চট্টগ্রাম জালালাবাদ যুদ্ধ ও যুব বিদ্রোহের অন্যতম এ বীর সৈনিকের দেহভস্ম ছড়িয়ে আছে তার প্রিয় জন্মভূমি চট্টগ্রামে। আলোর কণ্ঠ পরিবারের পক্ষ থেকে আজীবন অসাম্প্রদায়িক ও গণমানুষের শোষণমুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত এ বিপ্লবীর প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন।