চসিকের দুর্নীতি ও জনপ্রত্যাশা

চসিকের দুর্নীতি ও জনপ্রত্যাশা
কামরুল হাসান বাদল. লেখক, কবি ও সাংবাদিক
মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী নিজ হাতে টাইলস ভাঙছেন এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল কয়েকদিন আগে। পরে সংবাদমাধ্যমে যা জানা যায় তা হলো, গত বৃহস্পতিবার সকালে সংস্কার কাজ পরিদর্শনে যান মেয়র রেজাউল করিম। সে সময় তিনি নিমতলা সংলগ্ন সড়কে ফুটপাতের উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে সেখানে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কাউকে দেখতে পাননি। একসময় মেয়র ফুটপাতে বসানো টাইলস পরীক্ষা করে দেখতে পান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সেখানে নিম্নমানের টাইলস বসানো হয়েছে। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে নিজ হাতে কয়েকটি টাইলস ভাঙেন এবং তাৎক্ষণিক সবগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেখানে ইঞ্জিনিয়ার তো দূরের কথা। সুপারভাইজারও ছিল না। পরে টাইলস দেখতে গিয়ে দেখা যায়, বালু দিয়ে সেগুলো কোনভাবে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। টাইলসগুলোও দুই নম্বর। এসব অনিয়ম দেখে মেয়র মহোদয় অনেক রাগারাগি করেছেন।’
এরপর এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অনিয়মের নানা অভিযোগ নিয়ে জড়ো হয় স্থানীয়রা। এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে মেয়র রেজাউল বলেন, ‘এ শহর আমার একার নয়, আপনাদেরও। আজকে থেকে সড়ক সংস্কারে কোনো অনিয়ম হলে আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করবেন। আর কেউ কিছু বললে সেটা সরাসরি আমাকে বলবেন।’
ঘটনাস্থল থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ারকে মুঠোফোনে মেয়র বলেন, ‘এখানে মাটি লাগাচ্ছে। আর আপনারা বসে বসে বলছেন- এখানে টাইলস লাগাচ্ছে। আমি আপনাকে এখান থেকে সরিয়ে দেব। আপনারা ফাজলামি শুরু করছেন, তাই না? মেয়র এসময় রাগান্বিতভাবে বলেন, আপনার এখানে সুপারভাইজার কোথায়? আমি সারাদিন ঘুরে কাউকে পাইনি।’
এতটুকু পড়ার পর অনেকে ভাবতে পারেন চমৎকার তো! একেবারে হাতেনাতে ধরা! দুর্নীতি করে যাবে কই? কিন্তু বাস্তবতা কী তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলীর বয়ানে শুনুন, ‘এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলছে। আজ মেয়র এসে হাতেনাতে ধরেছে। আসলে সড়ক বা ফুটপাত সংস্কারে চরম গাফেলতি হচ্ছে।’
আমি এক সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করলাম, এরপর দু নম্বর টাইলসগুলো কি তুলে ফেলা হবে? তিনি আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, আপনার মাথা খারাপ, দু থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত লাগানো টাইলস তুলবে? মেয়র যেখানে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় বলেছেন এসব তুলে ফেলতে হবে সেটুকু জায়গার টাইলস শুধু তোলা হবে। আপনি সপ্তাহখানেক পরে জায়গাটি দেখে এসে আমাকে জানায়েন।
আসলে গাফেলতি কোথায় হচ্ছে না? অনিয়ম-দুর্নীতি কোথায় হচ্ছে না? বরং এখন সংবাদ হতে পারে ওমুক বিভাগে বা স্থানে দুর্নীতি -অনিয়ম হচ্ছে না।
দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রাই শুরু করেছিল অনিয়ম আর জোড়াতালি দিয়ে। যে সংকট কখনোই কাটাতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান দুটি সমস্যা হলো অর্থ সংকট ও দুর্নীতি। দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানটি এতই গভীরে যে তা উৎপাটন করা খুব সহজ নয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সময়ে তাঁর অতি জনপ্রিয়তাকে ভয় করে দুর্নীতিবাজরা কিছুটা সমঝে চললেও পরবর্তী কোনো মেয়র দুর্নীতি অনিয়মের লাগাম টানতে পারেননি।
দুর্নীতির আরেকটি নমুনা তুলে ধরি।
প্রতি মাসে কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয় বলে জানা গেছে বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের রাস্তা দখল করে থাকা ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের। একটি স্থানীয় দৈনিকে বলা হয়েছে, এখানে বছরের পর বছর ধরে চলে চাঁদাবাজি। স্থানীয় মাস্তান থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগবাটোয়ারা হয় চাঁদার অর্থ। এ কারণে রাস্তা দখল করে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজারে পথচারীদের পথচলা দায় হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নিয়ন্ত্রণাধীন এই বাজারটি অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলেও পত্রিকায় অভিযোগ করা হয়েছে।
পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদক লিখেছেন, সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে বছর দেড়েক আগে সাবেক মেয়রের সময়কালে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। ৮ কোটি ১৫ লক্ষ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৯ হাজার ২০০ বর্গফুটের দোতলা ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও পরবর্তীতে শুধুমাত্র নিচতলায় বাজার চালু করা হয়। ভবনটির নিচতলায় কাগজে-কলমে ১০০ বর্গফুটের ১০টি দোকান, ৩০ বর্গফুটের ১৯০টি দোকান থাকার কথা। ২য় তলায় ১০০ বর্গফুটের ৯০টি দোকান থাকার কথা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, কোটি কোটি টাকার ঘাপলার কারণে অপরিকল্পিতভাবে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ভবনটির দক্ষিণ-পূর্ব পাশে চলাচলের মূল সড়কটি সরু হয়ে গেছে। আশপাশের ভবন মালিকরা অভিযোগ করেন, বাজারের মূল ভবন নির্মাণ করার সময় প্ল্যানে না থাকলেও উত্তর পাশে ১০টি দোকান নির্মাণ করা হয়। এতে সড়কটির বেশ কিছু অংশ মার্কেটের ভেতরে ঢুকে যায়। অবশ্য সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি অস্বীকার করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্পোরেশনের জায়গায় ভবন নির্মাণ করে মার্কেট চালু করা হয়েছে বলে দাবি করেন।
তবে বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে রাস্তা দখল করে শত শত দোকান চললেও নতুন ভবনটিতে বেশিরভাগ দোকান খালি পড়ে আছে। এসব দোকান কেউ ভাড়া নিতে আগ্রহ দেখান না বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন । আবার যেসব দোকান চলছে সেগুলোতেও বেচাবিক্রি কম। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে লোহার গ্রিল ও দেয়াল থাকায় ক্রেতারা বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না।
এসব কারণে সিটি কর্পোরেশনের বৈধ বাজারটি না চললেও এই বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজারের অবস্থা জমজমাট। অবৈধ এই বাজারের কারণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেও মূল মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, বাজারের ভেতরে রাস্তার ওপর দোকান বসিয়ে কিংবা মালামাল রেখে ক্রেতা সাধারণের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। বাজারের ভেতরে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার ছড়াছড়ি। ছাগল জবাইসহ মাছ-মাংসের বর্জে্যপ বাজারের অবস্থা চরম অস্বাস্থ্যকর।
এই অবস্থা যে শুধু বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের তা কিন্তু নয়। সারা শহরেই চলছে এমন অব্যবস্থাপনা। শহরের একটি ফুটপাতও পাওয়া যাবে না যেখানে অবৈধ দোকান বা স্থাপনা নেই। সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবৈধ দখলকারীদের হাত থেকে ফুটপাত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব না হওয়ার কারণ জনগণের কাছে পরিষ্কার হলেও এর পেছনে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না সিটি করপোরেশন ও পুলিশ বিভাগ। অভিযোগ আছে ফুটপাত ঘিরে যে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয় তার ভাগবাটোয়ারা সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই পৌঁছায় ফলে এদের উৎখাত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
চসিকের ট্রেড লাইসেন্স ও গৃহকর আদায় নিয়েও দুর্নীতি ও ভোগান্তির অভিযোগ এন্তার । এরমধ্যে ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে ধাপে ধাপে ভোগান্তি এবং নবায়ন করতে অতিরিক্ত টাকা না দিলে তা ইস্যু না হওয়ার অভিযোগ বেশ পুরানো। জানা গেছে, চসিকের ৮টি সার্কেল রয়েছে। প্রতিটি সার্কেল অফিসের বিরুদ্ধেই অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে নাগরিকদের । এ নিয়ে দুদকেও অভিযোগ জমা পড়েছে। নির্ধারিত ফি’র বিপরীতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করার অভিযোগও বেশ পুরনো । এমনকি কাগজপত্র থাকার পরও ভোগান্তির অন্ত থাকে না ট্রেড লাইসেন্স করতে আসা উদ্যোক্তাদের। রাজস্ব সার্কেল অফিসগুলোতে বেশিরভাগ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নামকাওয়াস্তে অফিসে আসেন। অনেকেই মাঠে গেছেন অজুহাত দেখিয়ে অফিস করেন না। ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভোগান্তির শিকার হতে হয় সবাইকে । লাইসেন্স পেতে হয়রানি এড়াতে দালাল ও পরিদর্শকদের বাড়তি টাকা গুনতে হয়। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীরা ঝামেলা এড়াতে মুখ খোলেন না।
মোট কথা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অনিয়ম বা দুর্নীতি নিয়ে লিখতে গেলে তা শেষ করা যাবে না। এসব অভিযোগের কারণে দুদক অভিযানও পরিচালনা করেছে। সম্প্রতি সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন কাজে ব্যপক দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে তৎপর হয়েছে দুদক। নগরবাসী চায় সিটি করপোরেশনে গেড়ে বসা দুর্নীতির চক্রটিকে নির্মূল করতে দুদক আরও অনুসন্ধান চালাবে এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণে সংস্থাটিকে সক্ষম করে তুলবে।