এখন কেন গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব?

এখন কেন গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব?
কামরুল হাসান বাদল
মানুষ ভুলতে চেয়েছিল দুঃসময়কে। উপেক্ষা করতে চেয়েছিল মহামারীকে। মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল থেমে যাচ্ছে ধরে নিয়ে জীবনের জয়গানে মুখর করে তুলছিল চারপাশ। আবার মানুষ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার, পাশে দাঁড়াবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ছিল। ঠিক সে সময় দুঃসংবাদটি শোনা গেল। ওমিক্রন নামে করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্টটি আরও মারাত্মক, আরও সংক্রামক। এই দুঃসংবাদ শুনতে শুনতেই অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে করোনাভাইরাস আবার ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। ঘরে ঘরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের শয্যা ভরে যাচ্ছে রোগীতে।
বাংলাদেশের অবস্থাও তাই। মৃত্যুহীন কিছুদিন চলার পর আবার সাইরেনের পুনঃপুন শব্দে আতঙ্কিত মানুষ অসহায়ভাবে এর-ওর দিকে তাকাচ্ছে আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় দিনাতিপাত করছে।
এমন দুঃসময়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ তাদের কাছে বজ্রাঘাতের মতো মনে হয়েছে, আর তা হলো গ্যাসের মূল্য ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব। এ সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর মতো কোনো হটকারী সিদ্ধান্ত কারও মাথায় আসতে পারে তা-ও অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল দুই মাস আগে। এর ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে এর যে প্রভাব পড়েছে তা কাটাতে না কাটাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর নাটক শুরু হয়েছে। এ মাসের শুরুতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি বিভাগ। ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে এমন সিদ্ধান্তের কথা জানায় তারা। এরপর ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি অভিন্ন প্রস্তাব তৈরি করে। আবাসিকে দুই চুলায় ৯৭৫ থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ১০০ টাকা ও এক চুলায় ৯২৫ থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করতে চায় তারা। আবাসিকে প্রিপেইড মিটার, শিল্প-কারখানা, সিএনজি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ক্যাপটিভে (শিল্পকারখানায় নিজস্ব উৎপাদিত বিদ্যুৎ) ব্যবহৃত গ্যাসের দামও দ্বিগুণের বেশি করার প্রস্তাব করা হয়। তবে তাদের সে প্রস্তাব বিধিসম্মত না হওয়ায় ফিরিয়ে দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
বিইআরসির দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদপত্র এই খবর ছাপিয়েছে। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সম্ভবত তাদের আপত্তি নেই। তারা বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর আবেদন করতে হলে প্রবিধানমালা মেনে প্রস্তাব জমা দিতে হবে। বিতরণ কোম্পানি তা মানেনি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দেয়নি। তাই তাদের নিয়ম মেনে আবেদন করতে বলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বৈধ কোনো আবেদন জমা পড়েনি। মনে হচ্ছে কথিত ‘প্রবিধান’ মেনে আবেদন করা হলে বিইআরসি দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে নিতে পারে।
বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে এখন দিনে গড়ে ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ২৩০ কোটি ঘনফুটের (৭৮ শতাংশ) বেশি আসে দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে। আর কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি হয় মোট সরবরাহের ১৭ শতাংশ। আর ৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে কেনা হয়। এখন এই ৫ শতাংশ গ্যাসের বাড়তি দামের নামে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি করার প্রস্তাব করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
পেট্রোবাংলা গণমাধ্যমকে বলছে, গত মাস থেকেই দেশে গ্যাস সরবরাহে সংকট শুরু হয়েছে। আগামী এক মাসেও সংকট কাটার সম্ভাবনা নেই। বাসায় চুলা জ্বলছে না। শিল্পকারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে গ্যাসের অভাবে। মহেশখালীতে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি বন্ধ হয়ে আছে। বাকি একটি দিয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।
বিইআরসির চেয়ারম্যান পত্রিকাকে বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি, মূল্যবৃদ্ধির আবেদনও যথাযথ হয়নি। প্রবিধানমালা মেনে প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। প্রস্তাব জমার পর তা যাচাই-বাছাই করে কমিশনের কারিগরি কমিটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেবে। এরপর তা আমলে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।
কমিশন আমলে নিলে প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি হবে। এরপর দাম বাড়ানো বা না বাড়ানোর বিষয়ে কমিশন আদেশ দেবে। এর আগে ২০০৮ সালে বিতরণ কোম্পানির দেওয়া ৬৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিল কমিশন। ২০১৯ সালে শেষবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মতে, দেশে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট (হাজার ঘনমিটার) গ্যাসে পেট্রোবাংলার খরচ দুই টাকার কিছু বেশি। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আনতে এখন ইউনিটপ্রতি খরচ পড়ছে ৩৮ টাকা। বর্তমান দামে খোলাবাজার থেকে আমদানি করতে হলে ইউনিটে খরচ হবে ৮৫ টাকা। এ হিসেবে গড়ে ইউনিটপ্রতি খরচ ধরে দাম দ্বিগুণ করতে চায় বিতরণ কোম্পানি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববাজার থেকে এখন এলএনজি আমদানি খরচ ৮৫ টাকা ৫০ পয়সা । এতে সব মিলে পেট্রোবাংলার প্রতি ইউনিট গ্যাস সরবরাহের গড় খরচ পড়বে ২১ টাকা। আর বর্তমানে গ্রাহকের কাছে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৯ টাকা ৩৭ পয়সায়।
অন্যদিকে পেট্রোবাংলা বলছে, বিতরণ কোম্পানি গ্যাস বিক্রির কমিশন পায়। তাদের তো লোকসানের কিছু নেই। কিন্তু গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে লাভ-লোকসানের হিসাব করতে হয় পেট্রোবাংলাকে। বিতরণ কোম্পানি গ্যাস বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে না পারলে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি আনতে হয় পেট্রোবাংলাকে। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, গত অর্থবছরেও সরকারি তহবিলে কয়েক শ কোটি টাকা জমা দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তাদের মতে, সরকারি ছয় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস, কর্ণফুলী, জালালাবাদ, বাখরাবাদ, সুন্দরবন ও পশ্চিমাঞ্চল মুনাফা করেছে সর্বশেষ বছরেও। একইভাবে মুনাফা করেছে সরকারি গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএল।
বিইআরসি’র দু’জন শীর্ষ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, মূল্যবৃদ্ধির এই প্রস্তাবকে তারাও অযৌক্তিক ও অবাস্তব বলে মনে করছেন। কমিশনের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে গ্যাসের পাইকারি মূল্য বাড়ানোরও কোনো যৌক্তিকতা নেই। খুচরা মূল্যবৃদ্ধি তো অনেক দূরের কথা। তারপরেও বিতরণ কোম্পানিগুলো কেন মূল্যবৃদ্ধির এমন প্রস্তাব নিয়ে এল, তা আমার বোধগম্য নয়। আমরা প্রাথমিকভাবে তাদের প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়েছি। দেখা যাক পরে কী হয়।’ বিইআরসির একজন সদস্য বলেন, ‘গত দুই বছরে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে। সিস্টেমে ৩০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে ২৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিজস্ব গ্যাস, যেটার দাম ওঠানামা করছে না। দ্বিতীয়ত ৬০০ মিলিয়ন গ্যাস আছে এলএনজি থেকে, এটা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে দাম ওঠানামা করছে না। আগামী ১০ বছরেও দাম ওঠানামা করবে না। বাকি ১৫০ মিলিয়ন গ্যাসের ক্ষেত্রে দাম কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেক্ষেত্রে ১৫০ মিলিয়নের দাম যদি ৫ টাকা করেও উঠানামা করে তাতে কী এমন আসে যায়? এর প্রভাব বাজারে কতটা পড়বে? আপনারাই অংকটা করে দেখেন।’
করোনাকালীন অর্থনৈতিক মন্দার সময় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো হবে। এ সময়ে ৯৭৫ টাকার গ্যাস বার্নারের খরচ ২১০০ টাকা করার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি গ্যাসের দাম বা দেশের গ্যাস সরবরাহ কোম্পানিগুলোর পরিচালন খরচ বাড়েও তাতেও তা ১৫ থেকে ২০ ভাগের বেশি হতে পারে না। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও মাত্র ৫ ভাগ গ্যাস খোলা বাজার থেকে কেনার অজুহাতে গ্যাসের দাম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধির প্রস্তাব অনভিপ্রেত, বাস্তবতাবিবর্জিত ও কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ। গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের ব্যয় বাড়বে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এর ফলে আরেক দফা জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। অর্থাৎ সমাজের সব স্তরেই এই মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেবে।
করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কারণে মানুষের জীবন আবার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে যাচ্ছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে মহামারীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত, শ্রান্ত, নিঃস্ব সাধারণ মানুষকে এই সময়ে অন্তত এই চাপটা না দিলেই কি নয়? এমনিতেই সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। প্রতিদিন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে ন্যায্যমূলের পণ্যের ট্রাকের সামনের লাইন। লাফ দিয়ে বাড়ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, ক্রমাগত বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এর মধ্যে গ্যাসের মতো একটি পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব যারা দিতে পারেন তাদের বাস্তব জ্ঞান আছে কিনা, তারা সাধারণ মানুষের খবর রাখে কিনা, তারা সড়কে যাতায়াতের সময় টিনের চশমা পরে থাকেন কিনা তা জানতে ইচ্ছে করছে।
করোনাকালীন গত দুই বছরে সরকারি চাকুরেদের কোনো সমস্যা হয়নি। তাদের কোনো মাসের বেতন কাটা যায়নি। বেতন বাকি পড়েনি। তাদের কেউ চাকরিচ্যুত হয়নি। কিন্তু এর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকানে যারা চাকরি করেন তাদের কী অবস্থায় চলতে হয়েছে, সামনেও আবার চলতে হবে তা নীতিনির্ধারকেরা কি জানেন? জানেন কি মহামারীর কারণে নতুন করে গরিব হওয়া মানুষের সংখ্যা? জানেন কি গরিবদের প্রকৃত অবস্থা?
আনন্দের সংবাদ যে, দীর্ঘ মহামারীতেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়নি। বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিশ্বদরবারে প্রশংসিত হয়েছে। চলমান মেগাপ্রকল্পগুলোর কাজ বিরতিহীনভাবে করে সমাপ্তির পথে এনেছে। এই পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাকে ২০ লক্ষ ডলার ঋণ দিয়েছে। কাজেই এমন পরিস্থিতিতে ভর্তুকি কমানোর অজুহাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া যায় না।
মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকারীদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে যে, তারা ভর্তুকি কমাতে চায় নাকি জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের জনপ্রিয়তা কমাতে চায়।