রাষ্ট্রটি সভ্য হোক, সমাজটি মানবিক হোক »কামরুল হাসান বাদল

রাষ্ট্রটি সভ্য হোক, সমাজটি মানবিক হোক »কামরুল হাসান বাদল. লেখক, কবি ও সাংবাদিক
বিশ্বে সাধারণত তিন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু আছে। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা তথা বাজার অর্থনীতি, সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা ও মিশ্র অর্থব্যবস্থা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বের কোথাও এখন সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা পুরোপুরি চালু নেই । অধিকাংশ দেশই এখন ধনতান্ত্রিক তথা বাজার অর্থনীতিতেই পরিচালিত হচ্ছে। চীন এবং অধুনা কিউবার মতো কয়েকটি দেশ মিশ্র অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিবেচিত। এর বাইরে ইসলামি অর্থব্যবস্থা বলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। এই ব্যবস্থাও কোথাও পুরোপুরি চালু নেই। যাই হোক সবধরনের অর্থব্যবস্থাপনায় ব্যাংক বা ব্যাংকিং ব্যবস্থা একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
ব্যাংক শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, রেনেসাঁ যুগে ইটালীর লোম্বার্ডী নামক স্থানে অবস্থিত বাজারের মধ্যে ধনী ব্যবসায়ীগণ লম্বা বেঞ্চ পেতে টাকা পয়সার লেনদেন করত। এ বেঞ্চকে ইটালীর ভাষায় ব্যাংকো বলা হতো। টাকা পয়সা লেনদেনের কাজ যে বেঞ্চে বসে সম্পন্ন করা হতো তার বিভিন্ন আঞ্চলিক নাম ছিল যথা-ব্যাংকো, ব্যাংকা, ব্যাংকাছ ইত্যাদি। এ শব্দগুলোর মধ্যে ব্যাংকো শব্দটিই সর্বাধিক প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে এ ব্যাংকো হতেই ব্যাংক শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। এখানে একটি মজার তথ্য তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়ও এ ধরনের বেঞ্চকে বাংকু বলা হয়। এ শব্দ চট্টগ্রামের ভাষায় ঢুকে গেল কীভাবে তা নিয়ে ভাববার অবকাশ আছে বৈকি।
ব্যাংকিং ইতিহাসের ৪০০ সাল হতে ১৪০০ সাল পর্যন্ত সময়কে ব্যাংক ব্যবস্থার মধ্যযুগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় থেকেই ব্যাংকের কার্যাবলী উন্নত হতে শুরু করে।
১৪০০ সাল থেকে ব্যাংক ব্যবস্থার আধুনিক যুগের সূচনা হয়। ১৪০১ সালে ‘ব্যাংক অব বার্সিলোনা’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ব্যাংকের কার্যাবলী বিস্তৃত হতে থাকে। এ ব্যাংককেই বিশ্বের সর্বপ্রথম আধুনিক ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৪০৭ সালে ‘ব্যাংক অব জেনোয়া’, ১৬০৯ সালে ‘ব্যাংক অব আমস্টার্ডাম’, ১৬১৯ সালে ‘ব্যাংক অব হামবুর্গ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম সনদপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে ১৬৫৬ সালে সুইডেনে ‘ব্যাংক অব সুইডেন’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কয়েকবছর পরে ২৭ জুলাই, ১৬৯৪ সালে সুইডেনে বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে রিক্সব্যাংক অব সুইডেন প্রতিষ্ঠিত হয় এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিশ্বের ৮ম প্রাচীন ব্যাংক। পৃথিবীর প্রাচীনতম ব্যাংক হিসেবে মন্টে ডেই পাসচি ডি সিয়েনা স্বীকৃত। এর সদর দফতর ইতালির সিয়েনায়। ১৪৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটি এখনও চালু আছে। ১৭৩৪ সাল থেকে সিটি অব লন্ডনের থ্রেডনিডল স্ট্রিটে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সদর দফতর অবস্থিত। মুদ্রানীতি প্রণয়নসহ এটি সরকারের যাবতীয় ঋণ পরিশোধ, নোট তৈরি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশ্বের প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৫ সালে দুবাইয়ে। সুদ যেহেতু ইসলামে হারাম সেহেতু সুদ না নিয়ে লভ্যাংশ নেওয়ার রীতিই হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী প্রথম দেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে যেখানে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের চাকরি দেওয়া হতো এবং এই ব্যাংকের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর সবধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হতো। এই ব্যাংকের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল। বর্তমানে ব্যাংকটি বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংকে তো এখন মানুষ শুধু টাকাই রাখে না। এর কর্মপরিধি এখন অনেক বিস্তৃত। ঋণ প্রদান থেকে শুরু করে আমদানি-রফতানি ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলার মতো অনেক কাজ ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হয়। এক দেশ থেকে অন্য দেশে মুদ্রা আদান-প্রদানেও ব্যাংকের ভূমিকা মূখ্য। এখন ব্যাংক ছাড়া মানুষ থেকে রাষ্ট্র সবই অচল। ইসলামী ব্যাংক বলে যে দাবিই করা হোক না কেন সব ব্যাংকের কার্যক্রম মূলত একই। এর সঙ্গে অধুনা যুক্ত হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। বাংলাদেেেশ এর প্রচলন করে ব্র্যাক ব্যাংক।
আমার স্ত্রী ও ছেলের নামে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ অ্যাকাউন্ট আছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই ব্যবস্থাটা টাকা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়েছে। ভাবলাম একটা অ্যাকাউন্ট আমিও করি। ছেলে বলল, বাবা আমাদের তো বিকাশ তুমি বরং ‘নগদ’-এ অ্যাকাউন্ট করো। ‘নগদ’-এ আমার কিছুটা পক্ষপাত ছিল কারণ তার সঙ্গে পোস্ট অফিস তথা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তথা জনগণের অংশীদারত্ব আছে। ভাবছিলাম দুয়েকদিনের মধ্যে অ্যাকাউন্ট খুলব।
কিন্তু কয়েকদিন ধরে ওদের একটা বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি। বিজ্ঞাপনে দেখলাম এরকম- এক ব্যক্তি বলছেন, বাচ্চাদের জন্য টাকা পাঠাবেন। অন্য ব্যক্তি বলছেন, মোবাইলে পাঠান। প্রথমজন বলছেন, ভরসা পাই না তো। দ্বিতীয়জন বলছেন, নগদের ইসলামিক অ্যাকাউন্ট আছে। এখানে দিতে পারেন। এই কথোপকথনের পর বিজ্ঞাপনে আরও বলা হলো, কোটি মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে আছে নগদ…।
বিজ্ঞাপনটা দেখে ভাবছি, নগদের সাধারণ অ্যাকাউন্টে কি তাহলে ঝুঁকি আছে? একই কোম্পানি গ্রাহকদের সঙ্গে কি দু ধরনের আচরণ করতে পারে? ইসলামিক অ্যাকাউন্ট না হলে টাকা মার গেলে নগদ কি পুরো দায়িত্বটি নেবে না? নগদের ইসলামী অ্যাকাউন্টে আর কী কী সেবা আছে যা সাধারণ অ্যাকাউন্টে নেই? দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বাস করে। তারাও কি ইসলামিক অ্যাকাউন্টটি খুলতে পারবে? না পারলে এটি কি ন্যায্য আচরণ বলে বিবেচিত হবে? নাকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এটা একপ্রকার ফায়দা লোটার চেষ্টা? ধরুন এরাই ভারতে একই ব্যবসা করছে। সেখানে কি একই লক্ষে এরা জয় শ্রীরাম অ্যাকাউন্ট খোলার বিজ্ঞাপন দেবে?
একটা কোম্পানির নুডুলস খাচ্ছিলাম শুরু থেকে কয়েকবছর আগে হঠাৎ একদিন দেখি শীর্ষ এক পত্রিকায় পূর্ণ পৃষ্ঠা বিজ্ঞাপন সে নুডলসের- ‘এক শ ভাগ হালাল নুডলস’। আমি ধন্দে পড়ে গেলাম, কী সর্বনাশ! এতদিন কি তবে হারাম নুডলস খাচ্ছিলাম?
বছর বিশেক আগে হঠাৎ একটি হালাল সাবান এসে বাজারের সব সাবানকে নাকানিচুবানি খাইয়ে দিল এখন তার আর খবরই নেই। বাজারের স্বাভাবিক সাবানের কাছে মার খেয়ে গেল হালাল সাবান। অনেকে দেশের বাইরে গেলে হালাল চিকেন আর হালাল মাংসের দোকান খুঁজতে খুঁজতে পেরশান হয়ে পড়েন। তাদের এই কষ্ট দেখে আমার খুব মায়া হয়। আহা! হালাল চিকেন না খুঁজে যদি তারা হালাল রোজগারের চেষ্টা করতেন তাতে আখেরে তার লাভের সঙ্গে সঙ্গে জনগণেরও কিছু লাভ হতো বৈকি।
ধর্মকে তো রাজনীতির হাতিয়ার করা হয়েছে অনেক আগে এখন ব্যবসাতে ধর্মকে টেনে এনে সাধারণ ধার্মিকদের কি বোকা বানানো হচ্ছে না? ধর্মকে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করে কি ধর্মকেই অপমান করা হচ্ছে না? বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স নাম দিয়ে যখন রমজান মাসে চিনি কেলেংকারী করা হয় তখন কি পক্ষান্তরে বিসমিল্লাহরই অপমান করা হয় না? মদিনা হোটেলে যখন পচা খাবার পাওয়া যায় আর সাধারণ মানুষ বলে ‘মদিনার খাবার পচা’ তখন পক্ষান্তরে মদিনারই অপমান হয় না? ভাবছি ইসলাম ধর্মকে আর কোথায় কোথায় ব্যবহার করা হবে শেষ পর্যন্ত? একটি সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব ছিল অপরিসীম। রাজা-বাদশাহ-শাসকরা ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তার দোহাই দিয়ে, নিজেদের সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহভাজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে শাসন-শোষণের স্টিমরোলার চালাতেন। ফরাসি বিপ্লবের পর রাষ্ট্রে জনগণের অংশগ্রহণ ও জনমতের মূল্য বৃদ্ধি পায়। এই বিপ্লব মানবেতিহাসে একটি বড় ঘটনা। ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৯ মোট ১০ বছর, ৬ মাস, ৪ দিনের বিপ্লবের এই ঘটনা ইউরোপ তো বটেই পরবর্তীকালে সমগ্র বিশ্বের রাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। সে সময় রাষ্ট্রের ওপর ধর্ম ও গির্জার প্রভাব সংকুচিত হয় এবং রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিযুক্ত করা হয়। এখানে উল্লেখ করা খুব প্রয়োজন মনে করছি যে, ইউরোপে যখন রাজতন্ত্র তথা অভিজাততন্ত্রের দিন শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজলো তার মাত্র বত্রিশ বছর আগে এই উপমহাদেশে উপনিবেশিক শাসনামল শুরু করেছিল ইউরোপেরই বৃহৎ দেশ ইংল্যান্ড, যারা নিজেরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করলেও ১৯০ বছর পদানত করে রেখেছিল ভারত উপমহাদেশকে।
আজ বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র তথা জনগণের যে মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করার কথা বলা হয়, রাষ্ট্রে যে জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা হয় তা ফরাসি বিপ্লবের কারণেই হয়। এই বিপ্লবের মূলনীতি ছিল স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী। কিন্তু দুঃখজনক হলো এর কোনোটিই এখন পুরোপুরি বিদ্যমান নেই বিশ্বে। কোনোখানে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা আছে হয়তো ব্যক্তির স্বাধীনতা নেই। সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ না থাকলেও ইউরোপের অনেক দেশে সামাজিক সাম্য বছে তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিত্রতার বন্ধন বিলীন হতে চলেছে। আর আমাদের উপমহাদেশে না আছে সাম্য না আছে মৈত্রী।
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের মর্যাদা এক। আমাদের সংবিধানও সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব লিঙ্গের সম-অধিকারের নিশ্চিত করেছে। কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য আলাদা সুযোগ তৈরি করা কোনো সভ্য সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য সমীচীন নয়। ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ওপর ধর্মের খবরদারির অবসান হয়েছিল ২৩৩ বছর আগে। আমাদের আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেলে চলবে না। রাজনীতিকে ভণ্ডামিমুক্ত করতে হলে, রাষ্ট্রকে সভ্য ও সমাজকে মানবিক করে তুলতে হলে ধর্মকে লুণ্ঠনের হাতিয়ার বানানোর পথ রুদ্ধ করতে হবে। তা না হলে সমাজে অনৈতিকতা, অনাচার বাড়তেই থাকবে কারণ সুবিধাবাদীরা তাদের মতলব হাসিলের জন্য ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে। ফরাসি বিপ্লবের সুফল ভোগ করছে ইউরোপীয়রা আমরা কেন তার সুবিধা নেব না, আমরা কেন সভ্য ও মানবিক হয়ে উঠব না।
লেখক : কবি-সাংবাদিক