মাথিনের কূপ’ ধীরাজ-মাথিন প্রেমের এক নতুন তাজমহল – মাহবুব উল আলম

মাথিনের কূপ’ ধীরাজ-মাথিন প্রেমের এক নতুন তাজমহল
– মাহবুব উল আলম লেখক শিল্পী সাংবাদিক
মার্ক টোয়েন বলেছিলেন,”লাইফ ইজ স্ট্রেঞ্জার দেন ফিকশন ” তারই প্রতিফলন দেখি ধীরাজ ভট্টাচার্যের জীবনে।
কলিকাতার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ধীরাজ। আর আট-দশটি সাধারণ পরিবারের সন্তানদের মতোই বেড়ে উঠেছিলেন।
আইএসসি পাস করে পড়াশোনা আর হলো না শিক্ষক পিতার ছেলে ধীরাজের। হঠাৎ করে ধীরাজের বড় ভাই মারা গেলে পরিবারে নেমে আসে এক শঙ্কা। গোয়েন্দা আর রহস্য গল্প-উপন্যাসের পোকা ধীরাজের মাথায় অভিনয়ের ভূত চাপে। সে অভিনয়ও করে ফেলে। কিন্তু তার রক্ষণশীল পরিবার মানতে রাজি নয়। ধীরাজের বৃদ্ধপিতা তার পরিচিতজনদের বলে কয়ে একটি চাকরি জুটিয়ে দেন।
ধীরাজ কাজ করবেন পুলিশের গোয়েন্দা হিসেবে। স্বদেশী নেতাদের ফলো করাই তার মূল কাজ। কিন্তু সাদাসিধে ধীরাজ একাজ করতে গিয়ে বড্ড গোল বাধান।স্পাইয়ের জীবন ধীরুর জন্য নয়, তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। একপর্যায়ে পুলিশের ট্রেনিং নিয়ে এএসআই হিসেবে যোগ দেন বঙ্গদেশের চট্টগ্রামে।
ধীরাজ ভট্টাচার্জ যখন চট্টলায় পুলিশ কর্তার বেশে আসেন ঠিক তখনও চট্টলা এতো বৃহৎরূপ লাভ করেনি। লেখক তৎকালীন চট্টগ্রামের জনজীবন ও পরিবেশ সম্পর্কে বেশ মনোমুগ্ধকর বর্ণনা দিয়েছেন।
কিন্তু চট্টগ্রাম শহরে থাকাকালীন পুলিশের এসপি মুল্যান্ডের অহেতুক রোষানলে পড়েন লেখক। বড় সাহেবের মেমসাহেব বউয়ের সাথে হ্যান্ডসাম ধীরাজের ভালো সম্পর্কটাকে বড় সাহেব ভালোভাবে নেননি।
তাকে পোস্টিং দেয়া হয় মগ অধ্যুষিত টেকনাফ থানায়। তখন টেকনাফে যেতে দুদিনের মতো লেগে যেত,টেকনাফ ছিল এক দুর্গম অঞ্চল বিশেষ।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে দেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত সীমান্ত থানা টেকনাফে বদলী হয়ে আসেন সুদর্শন পুলিশ অফিসার ধীরাজ ভট্টাচার্য। তৎকালিন সময়ে অনেকটা দুর্গম ও ভয়ংকর জায়গা ছিল টেকনাফ। আর পুলিশের দারোগা ধীরাজ চাকরী করতে আসে সুদূর কলকাতা থেকে। তাই আত্মীয় স্বজনহীন খুবই একাকী সময় কাটাতেন তিনি।
ধীরাজ বাবু তার কাজের ফাঁকে প্রায় সময় থানার বারান্দায় আনমনা হয়ে বসে থাকতেন। তখন পুরো টেকনাফ জুড়ে এটিই ছিল একমাত্র পাতকুয়া। টেকনাফ থানা কম্পাউন্ডে ছিল এই পানির কূপ – যেখানে প্রতিদিন পানি নিতে আসতো আশপাশের রাখাইন যুবতীরা। সেখানে রাখাইন কন্যারা বেশ আড্ডা জমাতো। রং বেরংয়ের পোষাক পরে পাতকুয়া থেকে কলসী হাতে পানি নিতে আসা এসব রাখাইন যুবতীর মৃদু কন্ঠে ভেসে আসা সুরলা মধুর গান শুনে মুগ্ধ হতেন দারোগা ধীরাজ। ধীরাজ ভালো বাঁশী বাজাতে পারতেন। উদাস হয়ে মাঝে মাজে বাঁশীতে উদাসী সুর তুলতেন।
স্থানীয় জমিদার ওয়াং থিনের একমাত্র কন্যা – নাম তার মাথিন। মাথিনকে দেখে মনে মনে ভালবেসে ফেলে পুলিশ অফিসার ধীরাজ। এরপর থেকে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায়, বেলা অবেলায় থানার বারান্দায় বসে মাথিনের আসা-যাওয়া দেখতো এবং হ্নদয় দেয়া নেয়ার এক পর্যায়ে তাদের দু’জনের মধ্যে গড়ে উঠে ভালবাসার সম্পর্ক। সম্ভব অসম্ভব নানা জল্পনা কল্পনার স্বপ্ন জালে আবদ্ধ হয় ধীরাজ ও মাথিন।
মিয়া বিবি রাজি তো কেয়া কারেগা কাজি? কাজির কিছু করার না থাকলেও রিয়েল লাইফ ভিলেনরা অনেক কিছুই করে এবং যার ফলশ্রুতিতে মাথিনকে রেখে ভাগ্যের ফেরে ফিরে আসতে হয় ধীরাজকে।
মন দেয়া নেয়ার কিছুদিন যেতে না যেতেই কলকাতা থেকে হঠাৎ একদিন দারোগা ধীরাজের কাছে ব্রাহ্মন পিতার জরুরী টেলিবার্তা আসে। যেখানে তার বাবা লিখেছেন খুব জরুরীভাবে তাকে কলকাতা যেতে হবে। বাবার টেলিগ্রাম পেয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন পুলিশ অফিসার ধীরাজ। তবে যাওয়ার আগে দ্রুত ফিরে এসে মাথিনকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যাওয়ার পর ধীরাজ আর ফিরে আসেনি।
এ দিকে, ভালবাসার মানুষ ফিরে না আসায় অধির হয়ে দিন গুনতে শুরু করে জমিদার কন্যা মাথিন। ভালবাসার প্রিয় মানুষটার জন্য দীর্ঘ প্রহর গুনতে গুনতে অনিদ্রা আর অনাহারে নিজের সুন্দর জীবনটাকে এই কূপে চিরতরে বিসর্জন দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রাখাইন কন্যা মাথিন। বিষাদের কষ্ট এবং বেদনা-বিধুর প্রেমের বহুল আলোচিত সেই ঘটনার কালজয়ী স্বাক্ষী আজকের এই ঐতিহাসিক মাথিনের কূপ। সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ থানা কম্পাউন্ডের কূপটি এখনো পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় হয়ে আছে । সেই থেকে পাতকুয়াটির নামকরণ হয় ঐতিহাসিক মাথিনের কূপ।
বর্তমানে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের হাজার হাজার নারী-পুরুষ পর্যটক টেকনাফের ঐতিহাসিক মাথিনের কূপটি পরিদর্শনের জন্য ভিড় জমান। এই সময়ের প্রেমিক প্রেমিকারা মাথিন ও ধীরাজের অমর প্রেম কাহিনী নিদর্শনের মধ্য দিয়ে তারা যে যার মত করে নিজেদের পবিত্র প্রেম-ভালবাসাকে মিলিয়ে নিচ্ছেন। প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যায়ে মাথিনের কূপটি আধুনিকায়ন করা হয় ২০০৮ সালে ।