পারিবারিক বন্ধনঃ প্রেক্ষিত অস্থির সময়

পারিবারিক বন্ধনঃ প্রেক্ষিত অস্থির সময়
মাহবুব উল আলম বাবলু
(লেখক বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাফেশ টেলিভিশনের একজন তালিকাভূক্ত গীতিকার)।

বড্ড অস্থির একটা সময় আমরা পার করছি। আর এই অস্থিরতা ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের
পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্রকে। উপলব্ধির শাণিত রুপটা হারাচ্ছে তার জৌলুসের
ধার। এমনটা কি হবার কথা? নাকি এমনই হয় ?
শিরোনামেই বলেছি পারিবারিক বন্ধনের প্রেক্ষিতে অস্থির এ সময়টাকে আমি
ব্যাখ্যা করতে চাইছি। প্রাচ্যের দেশগুলো একসময় ফ্যামিলি ভ্যালুজ নিয়ে
গর্ব করতো। আজ সে জায়গাটি ক্রমশ নিস্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। উল্টোদিকে
পাশ্চাত্যের দেশগুলো এর মর্ম উপলব্ধি করে আজ আবার ফ্যামিলি ভ্যালুজগুলো
ফিরিয়ে আনতে চাইছে। বক্ষমান নিবন্ধে আমি আমাদের দেশজ প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে
আলোকপাত করতে চাই।
আমি বিশ্বাস করি মূলতঃ ক্ষয়িষ্ণু পারিবারিক বন্ধনই আমাদের আজকের এই
অস্থির সময়ের জন্য দায়ী। এর একটা বৈশ্বিক প্রেক্ষিতও অবশ্য আছে। সেটা
নিয়ে বারান্তরে আলোচনা করা যাবে। দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনই বহমান সময়ের এই
অনিশ্চিত অবস্থা কাটাতে আমাদের সক্ষম করে তুলবে। তো চলুন দেখা যাক কি করে
আমরা আমাদের এই পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ়তর করে তুলতে পারি।
পুরো পরিবারটিকে কিছু সাধারণ নীতিমালার অধীনে নিয়ে আসুন। এই
নিয়ম-কানুনগুলো পরিবারের সব সদস্যদের জন্যই প্রযোজ্য হবে। সিদ্ধান্ত
নেয়ার ক্ষেত্রে আপনার সন্তানদেরও পাশে রাখুন, তাদের কথা শুনুন এবং তাদের
কথার মূল্যায়ন করুন। যে কোন পরিকল্পনায় প্রত্যেকের চাহিদার কথা আলাদা
আলাদাভাবে ভাবা প্রয়োজন। পরিবারের সাথে আনন্দঘন মুহুর্ত কাটান। দুপুরের
খাবার বা রাতের খাবার একসাথে একটেবিলে খাবার চেষ্টা করুন। সবার সাথে সবাই
কথা বলুন- শেয়ার করুন। শুধু কথা বলা নয়, কথা শোনার একটা রেওয়াজ সৃষ্টি
করুন। ভালো বা মন্দ দুটো অনুভূতিই সবাই সবার সাথে ভাগাভাগি করুন।
কখনোই প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ভংগ করবেন না। মনে রাখবেন ‘কমিটেড’ থাকা ও
‘কমিটমেন্ট’ রক্ষা করার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের একদিকে যেমন আস্থা ও
বিশ্বাস বাড়ানো সম্ভব, তেমনি তা আদায় করাও সম্ভব।
সন্তানদের কাজের প্রশংসা করুন। আমরা আমাদের সন্তানদের শুধু বকতেই
অভ্যস্থ। এমন কি যদি মনে করেন কোন একটা বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের উন্নতি
দরকার তা’হলে এভাবেও বলতে পারেন,‘যে ভাবে তুমি চেষ্টা চালাচ্ছো সেটা
অবশ্যই প্রশংসার দাবীদারদার, তবে পাশাপাশি তুমি এভাবেই চেষ্টা করে দেখতে
পারো।’
দৃঢ় পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো
পারস্পরিক বুঝাপড়া। এই এই বুঝাপড়াটি সহজতর হয় পারস্পরিক যোগাযোগের
মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশী আমাদের অভিজ্ঞতার
ঝুলিটি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। আমরা এই অভিজ্ঞতা পরিবারের সদস্যদের সাথে
যোগাযোগের মাধ্যমে শেয়ার করে এক এক জন অনন্য ব্যাক্তিত্ব অর্জন করতে
পারি।
পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রার্থনার গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা আছে।
আমরা যে ধর্মের অনুসারীই হই না কেন, প্রার্থনার সময়টিতে একসাথে প্রার্থনা
করলে, একে অন্যের মংগল কামনা করে প্রার্থনা করলে তাতে এক ধরণের নৈকট্য
সৃষ্টি হয়।
দৃঢ় পারিবারিক সম্পর্ক সম্পন্ন পরিবারগুলোতে হাসি তামাশা, কৌতুক একটা
নিত্য ব্যাপার। ‘সেন্স অফ হিউমার’ এ ক্ষেত্রে বিরাট একটা ফ্যাক্টর।
পরিবারে বিদ্যমান উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, টেনশান দূর করার ক্ষেত্রে ‘সেন্স
অফ হিউমার’ বেশ কাজ দেয়।
পরিবারের সদস্যদের মাঝে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয়ার মাঝেও নৈকট্য সৃষ্টি
হয়। এটা এক অপরের কাছাকাছি আসতে সাহায্য করে। স্থিতিস্থাপক ও নমনীয়
সম্পর্কগুলো আসলে এই শেয়ারিং এর মানসিকতার উপর নির্ভর করে।
পরিবারের সব সদস্যদের একই ধরণের আগ্রহ থাকবে – এমনটা নাও হতে পারে।
কিন্তু যদি একটা সাধারন আগ্রহ গড়ে তোলা যায় তাবে তা সম্পর্ককে অনায়াসে
দৃঢ়তর করবে। এর ফলে সদস্যদের মাঝে ছাড় দেয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হবে।
সেবার মানসিকতা তৈরি হলে মানবিক দিকগুলো বিকশিত হয়। কোন একটি
বৃদ্ধাশ্রমে বা এতিমখানায় গিয়ে পরিবারের সব সদস্য যদি তাদের সাথে একটি
বেলা খাবার গ্রহণ করেন তাহলে মনে যে কমনীয়তা সৃষ্টি হবে সেটি পারিবারিক
সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করবে।
অদ্ভুত শোনালেও সত্য যে, দৃঢ় পারিবারিক সম্পর্কসম্পন্ন পরিবারগুলো
প্রায়শই সমস্যাসঙ্কুল থাকে। এই সমস্যাকে সমষ্টিগত মোকাবেলা করতে গিয়ে
পরিবারে দারূণ একটা বন্ডিং সৃষ্টি হয়।
যেখানটিতে প্রাপ্য সন্তানদের যোগ্য কাজের স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ। পাশাপাশি
তাদের কাজে অনুমোদন দিন। দেখা যায় ‘স্বীকৃতি’ ও ‘অনুমোদন’ এর অনুপস্থিতে,
যেখানে তারা এ দুটো বিষয়ে সমর্থন পায়, সেখানেই ঝুঁকে। এই ঝুঁকে পরাটা
কখনো কখনো ঝুঁকিতে পর্যবসিত হয়। পরিবারের ভেতরে না পেয়ে অযাচিতভাবে
পরিবারের বাইরে কোথাও প্রশংসা ও মনোযোগ পেলে সন্তানরা বাইরের ব্যাক্তিদের
দ্বারাই চালিত হবে। সুতরাং সন্তনঅদের প্রসংসা ও তাদের প্রতি মনোযোগি হোন।
পরিবারে সন্তানের যে একটা গুরুত্ব আছে সেটা উপলব্দধিতে সন্তানকে সহায়তা
করা দরকার। আমার শৈশবে আমার বাবাই ছিলেন আমার ‘রোল মডেল’। অভিভাবক হিসাবে
আপনারই ‘রোল মডেল’ হওয়া উচিৎ যাকে সে অনুসরন করবে। আপনি নিজে হতে না
পারলে বিশ্বকে যারা পালটে দিয়েছে তাদের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে সাহায্য করুন।
যদি তা না করেন তবে সন্তান ‘রোল মডেল’ হিসাবে এমন কাউকে গ্রহন করবে যা
শুধু নেতিবাচিক ফলাফলই জন্ম দেবে।
মাঝে মাঝে অতিরিক্ত গুরুত্ব লাভের একটা প্রবণতা সন্তানদের মাঝে জেগে
উঠে। আগে দেখে নিন তার এই দাবীর পেছনে কি যুক্তি আছে। দেখানোর মতো যুক্তি
যদি তার না থাকে তবে আপনার যুক্তিগুলো তার সামনে তুলে ধরুন।
অনেক সন্তান সময়ের আগেই জীবনের মানে খুঁজতে যায়। হয় তাকে তার প্রশ্নের
সদুত্তর দিন না হয় তার দর্শনগুলো জেনে নিন। সমাধান একটা বেরুবেই।
একাকীত্ব পারিবারিক সম্পর্ক্কে নাজুক করে তোলে। চাকুরীরত স্বামী-স্ত্রী,
সন্তন্নের স্বল্পতা, যৌথ পারিবারিক কাঠামোর অনুপস্থিতি এই একাকীত্বটাকে
আরো বাড়িয়ে দেয়। সন্তানের সাথে ‘কোয়ালিটি টাইম’ ব্যয় করার জন্য সুযোগ
আপনাকেই বের করতে হবে। মনে রাখবেন এই একাকীত্বকে অপব্যবহার করার মতো
শক্তির অভাব নেই মোটেই।
কখনো কখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচার

দূরীকরণের ইচ্ছা জাগতে পারে
সন্তানের। সে ক্ষেত্রে রবিনহুড হতে চাওয়া বা ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার
জন্য সংক্ষিপ্ততম রাস্তা বের করতে চাইবে তারা। বুদ্ধিমত্তার সাথে সাথে
আপনাকে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। তাদের বলতে হবে আগে যোগ্যতা অর্জন
তার পর সে যোগ্যতার ব্যাবহার করেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচার দূরীকরণ
করা সম্ভব।
অভিভাবক শ্রেণির মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহা লক্ষনীয়। আপনি যদি
প্রযুক্তি ব্যবহারে ইচ্ছুক না হন বা অজ্ঞ থাকেন, তাহলে আপনার সন্তান
প্রযুক্তির অপব্যাবহার করছে কিনা তা বুঝবেন কি করে? সুতরং সন্তনের সাথে
বন্ডিং বাড়ানোর জন্যে আপনাকে প্রযুক্তি ব্যবহারে আপডেটেড ও আপগ্রেড
থাকতেই হবে।
আমরা আজকাল বেতনভূক শিক্ষক রাখি – অনেকটা তাদের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড
না জেনেই। এতে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা পাচ্ছে সন্তানরা। আর সেই সাথে
মোটিভেটেড হচ্ছে অজানা দর্শনে। যদি সম্ভব হয় তাদের শেখানোর দায়িত্বটা
নিজের কাঁধে নিন, আর না হয় সন্তান কি শিখছে তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন।
পারিবারিক কাঠামোর ভেতর যদি মুক্ত বুদ্ধির চর্চা হয় তাহলে ধর্মান্ধতা,
গোঁড়ামী আর মৌলবাদী চেতনা সন্তনদের প্রভাবিত করতে পারবে না। মূলতঃ
বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা পারিবারিক কাঠামোকে আরো দৃঢ় করে।
শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর সামাজিক কর্মকান্ডে সংশ্লিষ্টতা একদিকে যেমন
মনোদৈহিক সমৃদ্ধি ঘটায় তেমনি তা সন্তানদের অনভিপ্রেত কর্মকান্ড থেকেও
বিরত রাখে।
পরিবারই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার উপযুক্ত লালন ও পালনেই নিহিত আছে আমাদের
আজকের রাষ্ট্রিক ও সামাজিক অস্থিরতা দূরীকরণের উপাদান। আর এই অস্থির
সময়কে সুস্থির করার করার পূর্ব শর্ত অবশ্যই শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন।
আসুন সুখী সমৃদ্ধ একটি বাংলাদেশ গড়ার মানসে আমরা আমাদের পারিবারিক
কাঠামোটিকে দৃঢ় করি। আর সে লক্ষে পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিদ্যমান সম্পর্কটিকে করি সুদৃঢ়, শক্তিশালী আর অর্থবহ।