ভেজাল খাদ্য, দুর্বল আইন ও গুরুপাপে লঘু শাস্তি

ভেজাল খাদ্য, দুর্বল আইন ও গুরুপাপে লঘু শাস্তি
কামরুল হাসান বাদল
‘ভেজালে বিশাক্ত খাবার, ওষুধ, পানীয় ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য’।
আজকের লেখাটি শুরুর আগে রিপোর্টটির কিছু অংশ পাঠকদের আবার পড়ার জন্য তুলে ধরছি। ‘চট্টগ্রামের সব জায়গায় ফার্মেসিতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ। ফার্মেসিতে অভিযান চালালেই মিলছে মানহীন ওষুধ। ভোক্তারা ফার্মেসি থেকে এসব ওষুধ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। পড়ছেন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ উৎপাদন ও বিপণন আইনত দন্ডনীয় অপরাধ জেনেও কতিপয় অসাধু ওষুধ কোম্পানি ও ফার্মেসি ব্যবসায়ী অর্থের লোভে এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, ওষুধের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের হাজারী গলি। এ বাজারে রয়েছে ভেজাল ওষুধের অনেক গোডাউন। এখানে লাখ লাখ টাকার নকল-ভেজাল ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ সরকারি ওষুধের হরদম চলছে বেচাকেনা। এসব ওষুধ আবার চলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্নস্থানের ফার্মেসিগুলোতে। যার কারণে ফার্মেসিতে অভিযান চালালেই মিলছে মানহীন ওষুধ। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সব জেনেও নিরব থেকেছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, ওষুধ যেমন জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনি একই ওষুধ নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করলে কার্যকারিতা হারিয়ে জীবনহানিও ঘটাতে পারে। এছাড়া এসব ওষুধ খেলে চামড়ার ওপর মারাত্মক এলার্জি সৃষ্টিসহ কিডনি ও লিভার নষ্ট হতে পারে। মস্তিষ্কের প্রদাহে অজ্ঞান হয়ে মারাও যেতে পারে। সর্বোপরি এ ধরনের ওষুধ সেবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে রোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ ব্যবসার সিন্ডিকেটের সঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও কোম্পানির একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এদের হাত ধরে শহর থেকে গ্রামে সবখানে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ ফার্মেসিতে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ওষুধগুলো হাজারী গলির বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হয়।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘নগরীর হাট-বাজারে সামুদ্রিক মাছে বিষাক্ত রং ও ফরমালিন মিশিয়ে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। বলতে গেলে এখন কোথাও কেমিক্যালমুক্ত মাছ মেলে না। সবখানে ভেজাল আর ভেজাল। অধিক মুনাফার আশায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছেন। বাজারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন ভোক্তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরিয়া, ফরমালিনসহ নানা কেমিক্যাল ও কাপড়ের বিষাক্ত রং মিশিয়ে মাছকে বিপজ্জনক বিষে পরিণত করা হচ্ছে। পাইকারি আড়তগুলোতে মাছ স্ত‚প করে রেখে প্রকাশ্যেই ফরমালিন ছিটানো হয়। স্প্রে করা হয় কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি। মাছ আহরণ করার পর থেকেই প্রয়োগ করা হয় ফরমালিন। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাছগুলো তাজা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে ফরমালিন পুশ করা হয়। আর ছোট আকারের মাছগুলো ফরমালিন মিশ্রিত পানির ড্রামে চুবানো হয়। ফরমালিনযুক্ত বরফের মধ্যেই দিনভর চাপা দিয়ে রাখা হয় মাছ।’
অবশেষে ভেজালরোধে আইনে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। খাদ্যে ভেজাল দিলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে এসংক্রান্ত আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, কেউ এই অপরাধ করলে তার শাস্তি হবে ভ্রাম্যমাণ ও নিরাপদ খাদ্য আদালতে।
আমরা মনে করি, যত দ্রুত আইনে পরিণত হবে ততই মঙ্গল হবে জনগণের। কারণ এ ধরনের অপরাধ বাংলাদেশে নতুন নয়। এর চেয়েও ভয়াবহ, মারাত্মক ভেজালের দেশ বাংলাদেশ। এখানে শিশুখাদ্যে ভেজাল হয়। জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল হয়। এখানে মাস্টার গামে কেমিক্যাল মিশিয়ে বাঘাবাড়ির ১নং ঘি তৈরি হয়। এখানে মরা মুরগির ‘চিকেন ফ্রাই’ হরহামেশা বিক্রি হয়। এখানে অনেক অখাদ্যকে খাদ্য হিসেবে গেলানো হয়। পুকুরের পানিকে স্যালাইন হিসেবে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক, চর্ম, যৌন ও এইড্স রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলামের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ইটের গুঁড়ো মশলা হিসেবে কতটা উপকারী। কিংবা কাপড়ে দেওয়ার রং খাদ্য হিসেবে? তিনি বললেন, ইটের গুঁড়ো ও কাপড়ে দেওয়ার রং খেলে কিডনি ড্যামেজ হবে, লিভার পচে যাবে এবং ক্যান্সার হবে। আর এই তিনটি রোগ নিরাময়যোগ্য নয়, অর্থাৎ এসব খেলে মানুষ রোগে মারা যাবে। আর পানির কথা বলতে গিয়ে বললেন, সীতাকু- এলাকায় পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি।
কাজেই সহনশীল মাত্রার বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানি খেলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে হবে, এটি একটি বিষ। অন্যদিকে পানি সঠিকভাবে বিশুদ্ধ না করলে, পানিতে বিদ্যমান ক্ষতিকর মিনারেল রয়ে গেলে, পানিতে লিডের মতো ক্ষতিকারক পদার্থ থেকে গেলে তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে করে আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-বি বা জন্ডিসসহ পানিবাহিত সব ধরনের অসুখ হতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য সভ্য দেশে এই ধরনের অপরাধের শাস্তি কী কী হতে পারে? প্রথমেই তার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে, তার ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হবে। ভবিষ্যতে দোষী ব্যক্তি যেন ব্যবসা করতে না পারে তার ব্যবস্থা হবে, তার সরবরাহকৃত সব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হবে এবং জেল ও জরিমানা হবে। ওসব দেশে খাদ্যমান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উৎপাদনের পর একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে হোটেলের অবিক্রিত খাবার ফেলে দেওয়া হয়। খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল করার কথা ওদেশে কেউ ভাবতেও পারে না।
এর পাশাপাশি আমাদের দেশে কী হয়? অনেক বড় অপরাধ করেও, যেমন ভেজাল খাদ্য খাইয়ে ভোক্তাদের কিডনি বিকল করে, লিভার পচিয়ে ফেলে এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত করে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার পরও তাদের শুধু জরিমানা গুনতে হয়। সংশ্লিষ্ট কারখানা মূলত কয়েকমাসের জন্য বন্ধ হয়। পেঙ্গুইনের কারখানা বা উৎপাদন বন্ধ করতে হলে একই জিনিস সেঙ্গুইন নাম দিয়ে বাজারে ছাড়া হয়। এদেশে ভোক্তারা বঞ্চিত। তাদের যথার্থ অধিকার নেই। তাদের পক্ষে বলার জোরালো কোনো পক্ষও নেই।
রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাপ্রবণ। কাজেই এইসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্ম নিয়ে তারা কিছু বলে না। তাদের ইশতেহারে দেশকে ভেজালমুক্ত করার কোনো কর্মসূচি থাকে না, প্রতিশ্রুতিও থাকে না। পুলিশ এদের বিরুদ্ধে পারতপক্ষে ব্যবস্থা নেয় না। কারণ এই ধরনের ভেজাল ও নকল পণ্য প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় মাস্তান ও পুলিশ নিয়মিত বখরা নেয়। দেশের জিহাদকারীরা অসহায়, নিরপরাধ, লোকদের হত্যা করে। সমাজের শত্রু, মানুষের শত্রু এমন কাউকে আজও কিছু করেনি।
মেনে নিচ্ছি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা প্রদানে একটি সীমাবদ্ধতা আছে। তা থাকুক। প্রশ্ন হলো, নকল, ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারীদেরকে কি শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সময়ই শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? না কি এই বিষয়ে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা থাকবে? সার্বক্ষণিক নজরদারি করার কোনোই কর্তৃপক্ষই কি দেশে নেই? অভিযানের সময়েই শুধু সুফলটা পাব, আর অভিযানের শেষে সেই পূর্বাবস্থায়? যেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয় না বা সম্ভব হয় না সেখানকার মানুষ কি এই নকল- ভেজাল খাদ্য খেয়ে যাবে? জেনে শুনে যারা মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে তার শাস্তি কি শুধুই পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা? ওই ভেজাল খেয়ে অসুস্থ হওয়া হাজার মানুষের জীবনের দাম মাত্র ১০ লাখ টাকা?
গুরু পাপে লঘু শাস্তি হলে এ পাপ বন্ধ হবে না কখনো।