আর কত মৃত্যু, আর কত ক্ষয়

আর কত মৃত্যু, আর কত ক্ষয়
কামরুল হাসান বাদল বিশিষ্ট কবি সাংবাদিক, সংগঠক লেখক,ও টিভি ব্যক্তিত্ব
কয়েকবছর ধরে চেরাগী পাহাড় চত্বরে খুব বেশি যাওয়া হয় না। তার কারণও আছে, যেতে স্বস্তি ও সাহস পাই না। যে চেরাগী পাহাড় এলাকা একসময় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল, সৃজনশীল মানুষের মিলনস্থল ছিল তা এখন নেই। তবে গত দেড় মাসে নববর্ষ উদযাপন পরিষদের কাজের স্বার্থে বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছে। যতবারই গেছি ততবারই দেখেছি কিশোর-তরুণ-যুবকদের আড্ডা। সে আড্ডা একেবারে আজাদী অফিস পর্যন্ত বিস্তৃত। কয়েকদিন আগে দেখলাম আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেকের গাড়িই আটকে আছে অফিসের আগের মোড়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে একটি মোটর সাইকেল রাখার কারণে।
কয়েকবার গিয়ে এবং এই পরিস্থিতি অবলোকন করে অনুধাবন করলাম প্রতিদিন অন্তত চারবার এই প্রবীণ সম্পাদককে কী পরিমাণ বিড়ম্বনা সইতে হয়। কী পরিমাণ ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়।
এরই মধ্যে গত শুক্রবার ঘটে গেল এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। চেয়ারে বসা নিয়ে তুচ্ছ এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণ গেল এক তরুণের। ঘাতকও তারই বয়েসী।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরটি এমন, ‘এলাকার আধিপত্য বিস্তারে স্থানীয় দুই দল কিশোরের মধ্যে প্রায়ই লেগে থাকা বিবাদ এবং মারামারির জের ধরেই শুক্রবার রাতে নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে আবার মারপিটে জড়ায় তারা। এসময় আজাদী গলির ভেতরে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিএএফ শাহীন কলেজের দ্বাদশ বর্ষের শিক্ষার্থী ইভান (১৮)।’
জীবন সম্পর্কে এদের যথেষ্ট জানাশোনা না থাকায় এরা চটজলদি যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এবং তা খুনাখুনির মতো নির্মম ঘটনার বেলায়ও। এরা অপরিণামদর্শী, অদূরদর্শী। এটি আমাদের নগরায়ণের কুফল বলে বলা হলেও এমন দৃশ্য গ্রামে-গঞ্জেও কম নয়। সমস্যা হচ্ছে এদের হাত থেকে এদের মায়ের বয়েসি নারীও রক্ষা পায় না। এরা ক্রমে ক্রমে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর নেশার খরচ যোগাতে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। সচ্ছল, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তান ছাড়াও পথশিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা ভীষণ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
আগে আমাদের পাড়া-মহল্লায় সর্দারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ছিল। পাড়ায়-পাড়ায় এ ধরনের কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। পাড়ার মধ্যেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা ছিল। পাড়ার কোনো ছেলে এ ধরনের কাজে যুক্ত হয়ে পড়লে তার জন্য সালিশ-বিচার হতো, দোষী তরুণের পরিবারকে তার দায় নিতে হতো। এখন পাড়ায় পাড়ায় সেই সমাজবদ্ধতা নেই। কেউ কারো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। আর নতুনভাবে গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায় কে কোথা থেকে এসেছে তার খবর কেউ রাখে না। ফ্লাটের মধ্যে সীমিত সবার জীবন।
এই অবস্থায় ভাবি, আমাদের সন্তানদের রক্ষা করবে কে? এত বিপদ, বিপথ আর মৃত্যুর ফাঁদপাতা ভূখণ্ডে আমাদের সন্তানদের সুরক্ষা দেবে কে? যদি তাদের মাদরাসায় পাঠাই সেখানে আছে বলাৎকারের বিপদ, যদি মসজিদে পাঠাই সেখানে আছে ইসলামী উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যাওয়ার বিপদ, তাকে যদি অন্যত্র পাঠাই তাতে আছে মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী ও অস্ত্রবাজ হয়ে ওঠার বিপদ। ঘরে-বাইরে এত বিপদ, এত অবক্ষয়, এত মৃত্যুভয়, এত দুর্ভাবনা নিয়ে এখন আমরা অসহায় বাবা-মায়েরা কার কাছে যাব। কার কাছে গেলে, কার কাছে বিচার দিলে, কার শরণাপন্ন হলে আমাদের সন্তানদের জীবন রক্ষা হয়। তার আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত হয়। জানি না, জানি না। সে ত্রাণকর্তা কে?
বাবা মায়ের চেয়েও যখন ‘বড়ভাই’রা বড় হয়ে ওঠে আর এই ‘বড়ভাই’রা যখন আমাদের সন্তানদের পুতুল নাচের মতো সুতোর টানে নিয়ন্ত্রণ করে তখন আমরা অসহায়, ক্ষমতাহীন বাবা-মায়েরা সেই সুতোকে তো বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা রাখি না। আমরা পারি না সেই বন্ধন ছিন্ন করে বুকের ধনকে বুকের মাঝে আগলে রাখতে। তাই চোখের সামনে নিজ সন্তানকে পর হয়ে যেতে দেখি, উচ্ছন্নে যেতে দেখি, মাস্তান হয়ে উঠতে দেখি, খুনী হয়ে উঠতে দেখি এবং শেষতক খুন হয়ে যেতে দেখি। আমরা নিরুপায়। আমরা অসহায়। ‘বড়ভাই’রা আমাদের বুক খালি করে দিয়ে যায়। এক সন্তানকে দিয়ে অন্য সন্তানকে খুন করায়। এক পক্ষ কাঁদি সন্তানের শোকে তখন অন্য পক্ষ কাঁদি তাও সন্তানের শোকে। কারণ তাঁর আদরের, মমতায় গড়ে তোলা সন্তানটি আর তার নয়। সে তখন ‘বড় ভাই’ এর ক্যাডার এবং হত্যা মামলার আসামি। আর এই বয়সে যে কিশোর একটি হত্যা মামলার আসামি হয়ে ফেরারি জীবন কাটাবে কিংবা জেলের অভ্যন্তরে সাজা কাটবে সে বের হয়ে এসে তো আর আগের সে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে না। সে তো আর বাবা-মায়ের সেই ‘সন্তান’ হয়ে ফিরে আসবে না। বলাৎকারীর মতো, মাদকাসক্তের মতো, জঙ্গিবাদের মতো ভয়ংকর বিপদ ‘বড় ভাই’দের কাছ থেকে আমাদের সন্তানদের কীভাবে বাঁচাব এখন এটাই হয়ে উঠেছে আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা।
বিষয়টিকে শুধু ভাবনার এবং সমস্যার মধ্যে রেখে দিলে চলবে না। এখন থেকে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। কাজেই এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।এ ধরনের সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ দ্রুত বের করতে না পারলে সামাজিক নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে এবং তাতে সমাজ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। কাজেই প্রশাসন ও এদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং ও কাউন্সিলিং করতে হবে। সমাজের আলোকিত, আলোচিত ভালো মানুষদের যুক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। যে কোনো অপরাধী অপরাধ করার আগে একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেবে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে এই কিশোর-তরুণদের ব্যবহার না করে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কল্যাণের কথা ভাবতে হবে। অন্যের সন্তানকে প্রশ্রয় দিয়ে নিজের সন্তানকে নিরাপদ রাখার ভাবনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আজ কিশোর অপরাধের কথা বলছি বটে। সব দোষ কি শুধুই তাদের? এই তরুণ-যুবকরা যাবে কোথায়? ওদের সময় কাটানোর ও বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা তো আমরা করিনি। ওদের জন্য খেলার মাঠ নেই, ওদের জন্য পার্ক নেই, ওদের জন্য থিয়েটার নেই। সংস্কৃতিচর্চা নেই। মানবিকবোধ জাগিয়ে তোলবার মতো কোনো আয়োজনই নেই। ওরা পথভ্রষ্ট হবে না তো কে হবে।
সমপ্রতি ঢাকায় কলাবাগান এলাকায় তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার দাবিতে দেশের সকল স্তরের মানুষ সোচ্চার হয়েছে। ওই মাঠটি এলাকার শিশু-কিশোর, তরুণদের খেলাধুলা করার সুযোগ তৈরি করেছিল। তাছাড়াও ওই মাঠে ঈদের জামাতসহ নানা ধরনের সামাজিক উৎসবও সম্পন্ন হতো। কয়েকদিন আগে সেখানে একটি থানাভবন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। এলাকার বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মী সৈয়দা রত্না মাঠ রক্ষার দাবিতে সোচ্চার হলে তাঁকে তাঁর কিশোরপুত্রসহ থানায় কয়েকঘণ্টা আটক করে রেখে মধ্যরাতে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর মাঠরক্ষার আন্দোলনটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়া ঢাকায় একটি মাঠ হারিয়ে যাওয়া বড় একটি দুঃসংবাদ।
কী এক অজ্ঞাত কারণে সারাদেশেই খেলার মাঠ দখল করে নানা প্রকার স্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে নতুবা এমন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যাতে খেলাধুলা করা না যায়। চট্টগ্রামের অবস্থা তারচেয়েও খারাপ। এই শহরের দুটো মাঠ আউটার স্টেডিয়াম ও লালদিঘির মাঠ ‘নেই’ হয়ে গেছে। একসময় ডিসি হিলে বিকেল থেকে রাত অব্দি কিশোর-তরুণ-বয়স্ক নানা শ্রেণির মানুষ অবসর সময় কাটাতে পারত। প্রায় দশ বছর ধরে তা বন্ধ। চট্টগ্রামের ফুসফুস বলে খ্যাত সিআরবিতে একটি বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে সে জায়গাও সাধারণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন এই তরুণরা অবসর সময়টা কোথায়, কীভাবে কাটাবে তা কি নীতিনির্ধারকেরা ভেবেছেন?
আমাদের একটি সন্তান হারাই, তারপর কিছুদিন তা নিয়ে আলোচনা হয়, তার কারণ অনুসন্ধানে কিছু সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান তৎপর হয়। সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়, কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই আমরা সব ভুলে যাই, পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে ওঠে। সবাই স্বাভাবিক হয়ে যাই। শুধু সন্তানহারা মা বুকের ধন হারানোর অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে নিদ্রাহীন রাত পার করে বছরের পর বছর।
লেখক : কবি-সাংবাদিক