আজ মহান মে দিবস • কামরুল হাসান বাদল

আজ মহান মে দিবস (২০১৩ সালে লেখা)
৯ বছরে শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। শ্রমিকরা এখন আবার দাসে পরিণত হচ্ছে।
• কামরুল হাসান বাদল বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব
বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের উৎসবের দিন আজ। প্রেরণার দিন আজ। আজ মহান মে দিবস।
একটি সময়ে মানুষ বেচাকেনা হতো দাস হিসেবে। বেঁচে থেকে মালিকের হুকুম তামিল করার জন্যে যতটুকু শক্তির প্রয়োজন শুধু ততটুকু খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হতো দাসদের। পছন্দ না হলে আবার বিক্রি হয়ে যেতো অন্য মালিকের কাছে। একটি সময়ে কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলে দাসদের কর্মপরিধিরও বিস্তৃতি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রসহ তৎকালীন শিল্পোন্নত দেশগুলোতে শ্রমিকদের খাটতে হতো দাসদের মতোই। না ছিল তাদের ন্যায্য মজুরি, না ছিল নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টা । অর্থাৎ অধিকার বলতে তাদের কিছুই ছিল না তখন।
কিন্তু এক সময় মানুষ জেগে ওঠে। শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয় তাদের দাবি আদায়ে। হে মার্কেট চত্বর ভেসে যায় শ্রমিকের রক্তে। আমেরিকার ফেডারেশন অফ লেবার ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রথম প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের দাবি তোলে। শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের ১ মে ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই ধর্মঘটে যোগ দেয় প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক। ৩ ও ৪ মে শ্রমিকদের এই সমাবেশে পুলিশ গুলি চালালে ১০ শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৭ সালে একটি সাজানো মামলায় ফাঁসি দেয়া হয় ৪ জন শ্রমিককে। এই রক্তাক্ত ঘটনার পরে বহু প্রতিষ্ঠানে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আদায় হয়। অনেক কারখানায় কাজের সময়ও কমিয়ে আনা হয়।
১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেস। এই কংগ্রেসে ৮ ঘণ্টা দাবি আদায়ে শিকাগো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৮৯০ থেকে বিশ্বব্যাপী ১ মে পালিত হয়ে আসছে শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি ও উৎসবের দিন হিসেবে।
বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে।আজ সরকারি ছুটির দিন। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।
তবে বাংলাদেশে এবার মে দিবস এসেছে একটু ভিন্ন মেজাজ ও আবহে। কারণ গত ২৪ এপ্রিল ঢাকার অদূরে সাভারে রানা প্লাজা নামক একটি বহুতল ভবন ধসে শত শত পোশাকশিল্প শ্রমিক নিহত হয়েছেন। মারাত্মক আহত হয়ে সারা জীবনের জন্যে পঙ্গুত্বকে বরণ করতে হয়েছে অনেককে। এখনো নিখোঁজ আছে কয়েকশ শ্রমিক।
সেই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। মে দিবসের এই দিনটি জুড়েও উদ্ধারকাজ চলবে। বেরিয়ে আসবে চরম অনাদর আর অবহেলায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া শত শত শ্রমিকদের মধ্যে কারো কারো পচে যাওয়া, গলে যাওয়া বিকৃত লাশ। এই শোক, সন্তাপ, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বিক্ষুব্ধ দিনে জ্বলজ্বলে চেতনা নিয়ে, অধিকার প্রতিষ্ঠার শাণিত শপথ নিয়ে মে দিবস এসেছে বাংলায়। পালিত হবে সমগ্র বাংলাজুড়ে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আজ থেকে প্রায় সোয়া একশ’ বছর আগে শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের অধিকার নিয়ে শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে যে যুগান্তকারী সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, শ্রমিকদের প্রকৃত অধিকার দিতে শিল্পপতিরা বাধ্য হয়েছিল তা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় এখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশে তৈরী পোশাকশিল্প শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে আমরা সামান্যতম অগ্রগতিও সাধন করতে পারিনি।
বাংলাদেশে তৈরী পোশাকশিল্পের ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিন দশকের। এই শিল্প এখন বাংলাদেশের অন্যতম বিকাশমান শিল্প। রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জিত হয় এই শিল্পের মাধ্যমে। এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক যার ৭০ শতাংশ নারীশ্রমিক। কিন্তু এখনো এসব শ্রমিকের নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টা, ছুটি, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ড, মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মপরিবেশ এমন কি তাদের স্থায়ী নিয়োগপত্রের নিশ্চয়তাও দিতে পারেনি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক বা রাষ্ট্রপক্ষ। অপরদিকে চরম নিষ্ঠুরতা ও অবহেলার সাথে তাদের ঠেলে দেওয়া হয় কর্মক্ষেত্রে যা কাজের জন্য নিরাপদতো নয়ই বরং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুপুরীর সমতুল্য। কিন্তু কোন শিল্পের জন্যেই এই পরিস্থিতি কাম্য নয়, বিশেষ করে তৈরী পোশাকশিল্পের মতো সেক্টরে । তৈরী পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এই কৃতিত্বের পেছনে শ্রমিকের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের অবদানও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এই অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হলে শ্রমিক-মালিক-সরকারের মধ্যে সুসমন্বয়ের প্রয়োজন সর্বাগ্রে। শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোন পক্ষ যেনো এই শিল্প বিকাশে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সেদিকে সবার নজর থাকা জরুরি । কিছু অতি মুনাফালোভী মালিকের কারণে এই খাত বিপর্যয়ে পড়–ক তা কারো কাম্য নয় ।
স্পেকট্রাম ও তাজরিন গার্মেন্টসের বিয়োগান্তক পরিনতির স্মৃতি মুছতে না মুছতে রানা প্লাজার চারটি তৈরী পোশাক কারখানায় মৃত্যুঝুঁকি থাকার পরেও শ্রমিকদের বাধ্য করা হয়েছিল কাজ করতে। তার করুণ পরিণতি গত ২৪ এপ্রিল থেকে গোটা দেশবাসীর সাথে বিশ্ববাসীও অবলোকন করছে শোকার্ত হৃদয়ে। এখন শ্রমিকদের সাথে সাথে দেশবাসীরও প্রশ্ন এমন করে আর কত প্রাণ ঝরলে, কত শ্রমিক পঙ্গুত্ব বরণ করলে দেশে শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।আজ মে দিবসের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই উচ্চারিত হবে এই ক্ষোভ, বেদনা, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার কথা। আজ সকল আয়োজন ভারি হয়ে উঠবে স্বজন হারানোর বেদনা ও শোকে। কিন্তু আর কতকাল শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হবে তার কর্মস্থল। আর কতকাল জেনে-শুনে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেওয়া হবে নিরীহ শ্রমিকদের। আর কতকাল শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম কূটচাল আর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকা পড়ে থাকবে। যাদের রক্ত-ঘামে স্ফীত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি, যাদের শ্রমলব্ধ অর্থে জৌলুস বাড়ে মালিকের সেসব শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে কবে। কবে দেশের তৈরী পোশাকশিল্পসহ সকল শিল্প শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য হিস্যা পাবে।
রাষ্ট্র কিংবা মালিক শ্রেণী কবে নিশ্চিত করবে শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার। এই মে দিবসে এই প্রশ্নই উচ্চারিত হবে বারবার।