গান যেখানে শত শত মৃত্যুর কারণ

গান যেখানে শত শত মৃত্যুর কারণ
মান্নান মেহেদী ডেক্সঃ গান হয়তো কারও মনের খোরাক, কারও বিনোদন। কারও হয়তো একসময় জীবিকার অবলম্বন হয়ে ওঠে সংগীতের পথচলা। এই পথচলায় থাকতে পারে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু সেটা কখনো গোষ্ঠীগত যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, তা সাধারণত কারও মনে আসবে না। কিন্তু আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের রাজতন্ত্রের দেশ লেসোথোয় এমনটিই ঘটছে। হারমোনিয়ামনির্ভর ব্যতিক্রমী একধরনের সংগীত ঘিরে তারকা শিল্পীদের বিরোধ দেশটিকে আফ্রিকা মহাদেশের খুনের রাজধানীতে পরিণত করেছে। ‘হয়তো আমি নারী বলে বেঁচে গেছি’, শান্ত গলায় বললেন পুসেলেৎসো সিমা। একসময়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠের ছায়া তাঁর এই মৃদুস্বরে। তাঁর কণ্ঠ শুনতে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল ও অন্যান্য এলাকার হাজার হাজার ভক্ত বিয়ার হল ও স্টেডিয়ামে ছুটতেন। লেসোথোর জনপ্রিয় সংগীত ফামোর রানি হিসেবে প্রশংসিত তিনি। নিজের ছোট্ট সিমেন্ট ব্লকে তৈরি ঘরের বারান্দায় বসে আছেন তিনি। সংগীতে বছরের পর বছর সাফল্য পাওয়া এই শিল্পীর ঘরে তাঁর কোনো ছোঁয়া নেই। তিনি বলেন, ‘এখানে সবাই একটি বন্দুকের মালিক হয়ে নিজের শৌর্য দেখাতে চায়।’ সংগীত হিসেবে ফামোর শুরুটা একেবারেই ভদ্রোচিত। এর শুরুটা হয় পথিকদের ঐতিহ্যবাহী স্তবগানের মধ্য দিয়ে। শুরুতে কনসার্টিনা (একধরনের বাদ্যযন্ত্র) এবং পরে হারমোনিয়ামে (অ্যাকরডিয়ন) সুর তুলে এই গান গাওয়া হয়। স্তবগানগুলো ছিল অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত লোককবিতা বা র‍্যাপের মতো। দীর্ঘ সময় পশু চরানোর সময় রাখালেরা কিংবা লেসোথোর পাহাড়ে চরার সময় পর্যটকেরা এ ধরনের গান বাঁধতেন। ২০০৪ সালে একজন ফামো সংগীতশিল্পীর বিরুদ্ধে আরেকজনকে গুলি করার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই শুরু হয় প্রতিশোধ ও পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার চক্র। সঙ্গে শুরু হয় গানে গানে প্রতিপক্ষকে অপমান, হেয় করার রীতি। গত দুই দশকে বহু ফামো সংগীতশিল্পীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে এই সংগীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত শত শত প্রযোজক, ভক্ত ও ডিজে এবং সংগীতশিল্পীদের পরিবারের সদস্যদের। এই সংগীতের পৃষ্ঠপোষকদের একজন সেবোনোমোইয়া রামাইনোয়ানে। নৃশংসতার ধরন বোঝাতে তিনি বলেন, ‘তারা বাড়িতে তোমার খোঁজে এল। দেখল বাড়িতে তুমি নেই। তারা তোমার স্ত্রীকে হত্যা করবে, তোমার সন্তানদের হত্যা করবে। তারা পরিবারের সব সদস্যকে মেরে ফেলবে। এই ফামো সংগীতের কারণে গ্রামের পর গ্রামে এখন এতিমদের বসবাস।’ প্রাণের ভয়ে অনেকেই বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। লেসোথোর অধিকাংশই গ্রামীণ জনপদ। মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের দেশটিতে জনসংখ্যা ২০ লাখের মতো। স্থলবেষ্টিত দেশটির চারদিকেই দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্ত। জনসংখ্যা অনুপাতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যায় গত বছর বিশ্বে ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল দেশটি। এর প্রধান কারণ সম্ভবত এই ফামো যুদ্ধ। ফামোর উৎপত্তিটা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মনে করা হয়, লেসোথোর ভাষা সেসোথোর ‘ওয়াফামোলা’ শব্দ থেকেই নামটা এসেছে। সংগীতের তালে নারীদের নাচের উচ্ছ্বসিত মুহূর্তে স্কার্ট ফোলানো বা দোলানো বোঝাতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও লেসোথো—দুই দেশেই ফামো সংগীতশিল্পী ও তাঁদের ভক্তরা কয়েকটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। বিশেষ রঙের ঐতিহ্যবাহী কম্বল পরে নিজেদের একে অপর থেকে আলাদা রাখেন। তেরেনে গোষ্ঠীর রং হলুদ। এটা অন্যতম বড় গোষ্ঠী। সিখি গোষ্ঠীর কম্বলের রং আকাশি ও কালো। লেকাসে এই গোষ্ঠীর শিল্পী। যখন সহশিল্পীদের কেউ হুমকি পেতেন, তখন লেকাসে আত্মগোপনে চলে যেতেন। যদিও তিনি তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছিলেন। তিনি সব সময় সঙ্গে একটি বন্দুক রাখতেন। কাউকে হত্যা করেছেন কি না, সে প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি। হেসে প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। কিন্তু লেকাসে বলেন, ‘আমি পাল্টা লড়াই করেছিলাম। কারণ, যখন আমি কাউকে দাফন করতে দেখি এবং জানলাম অন্য দলের হাতে সে খুন হয়েছে, তখন আমি ক্ষুব্ধ হতাম। এ জন্য আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে।’ দক্ষিণ আফ্রিকা ও লেসোথো—দুই দেশেই ফামো সংগীতশিল্পী ও তাঁদের ভক্তরা কয়েকটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। বিশেষ রঙের ঐতিহ্যবাহী কম্বল পরে নিজেদের একে অপর থেকে আলাদা রাখেন। তেরেনে গোষ্ঠীর রং হলুদ। এটা অন্যতম বড় গোষ্ঠী। সিখি গোষ্ঠীর কম্বলের রং আকাশি ও কালো। লেকাসে এই গোষ্ঠীর শিল্পী। যখন সহশিল্পীদের কেউ হুমকি পেতেন, তখন লেকাসে আত্মগোপনে চলে যেতেন। যদিও তিনি তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছিলেন। তিনি সব সময় সঙ্গে একটি বন্দুক রাখতেন। কাউকে হত্যা করেছেন কি না, সে প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি। হেসে প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। কিন্তু লেকাসে বলেন, ‘আমি পাল্টা লড়াই করেছিলাম। কারণ, যখন আমি কাউকে দাফন করতে দেখি এবং জানলাম অন্য দলের হাতে সে খুন হয়েছে, তখন আমি ক্ষুব্ধ হতাম। এ জন্য আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে।’ যদিও এখন খুনোখুনি আর শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার লোভনীয় অবৈধ স্বর্ণের খনির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ফামো গোষ্ঠীগুলো লড়াই করছে। এসব খনিতে তাঁদের ভক্তরা কাজ করেন। শেষ বড়দিনে খনিশ্রমিক সেলো তাওতে তিন বছর পর লেসোথোয় আসেন স্ত্রী ও অল্প বয়সী দুই ছেলেকে দেখতে। কয়েক দিন পর নববর্ষ উৎসবে আরও তিন অতিথিসহ তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।