হযরত পীর বদর আউলিয়া বার্ষিক ওরস শরীফ

হযরত পীর বদর আউলিয়া বার্ষিক ওরস শরীফ
আমাদের চট্টগ্রাম শহরের আবাদ করা সেই মহান মনীষী হযরত বদর আউলিয়া (রা.) এর নাম। তাঁর পবিত্র স্মৃতির চিহ্ন আমাদের চট্টগ্রামকে গৌরব উজ্জ্বল করে রেখেছে। চট্টগ্রামকে বদর পীরের চট্টগ্রাম বলা হয়। ইতিহাস গবেষণায় প্রমাণিত হযরত বদর আউলিয়া (রা.) জঙ্গল পাহাড় ডাকা এই চট্টগ্রামকে জিন, ভূত, পেরত তাদেরকে তাড়িয়ে মানুষ বসবাসের আবাসস্থল তৈরি করেন। মহান সাধক পীর হযরত বদর আউলিয়ার সেই চিহ্ন চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম চেরাগীপাহাড় এ বিদ্যমান। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এই স্মৃতির চিহ্নকে সংরক্ষণপূর্বক নান্দনিকভাবে দেখার জন্য আলোকসজ্জা ও সৌর্ন্দয্য বর্ধন করেছেন। আরবী বছরের শাওয়াল মাসের নবম তারিখে এই মহান সাধক পুরুষের পবিত্র ওরশ মোবারক পালিত হয়। এ বছর ১৪৩৮ হিজরী ৯ শাওয়াল মঙ্গলবার মহাসমারোহে এই সাধক পীরের ওরশ শরীফ চট্টগ্রাম নগরীর বদরপাতিস্থ হযরত বদর পীরের মাজার সংলগ্ন মাঠে রাত-দিনব্যাপী কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। হযরত বদর পীর আউলিয়া (রা.) এর পবিত্র ওরশ শরীফে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক এই প্রবন্ধের মাধ্যমে হযরত বদর পীরের জীবন কর্ম ও বার আউলিয়ার শহর চট্টগ্রাম এর ইতিহাস তুলে ধরা হলো। আশা করছি এই প্রজন্ম হযরত বদর পীর ও বার আউলিয়ার শহর চট্টগ্রাম এবং প্রাচীন সময়ে চট্টগ্রামে মুসল আগমন সম্পর্কে তথ্য জেনে উপকৃত হবেন। বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক ও প্রাবন্ধিক সোহেল মুহাম্মদ ফখরুদ-দীন তার রচিত চট্টগ্রাম মুসলমান আগমনের ইতিকথা গ্রন্থের প্রথম সংস্করন ২০১৫ তে লিখেছেন, “নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) মক্কায় ইসলামের দাওয়াত শুরু করায় মক্কার শাসক গোষ্ঠি কুরাইশরা তার উপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন শুরু করে। অত্যাচারী কুরাইশরা ততোধিক নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে ইসলামের আহবানে সাড়া দেওয়া নবদীক্ষিত মুসলিমদের উপর। মক্কায় তাদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠলে আল্লাহর রসূল (সা) তাদেরকে আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) গমন করে আত্মরক্ষার অনুমতি দান করেন। সাহাবারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে আবিসিনিয়ায় গমন করেন। ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলা সাহাবী প্রথম ব্যাচে আরবের সুহাইবা বন্দর থেকে আবিসিনিয়ার অক্সামে গমন করেন। আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা আমা ইবনে আবজার (আল নাজাসী, নেগুস) তাঁদেরকে সাদরে বরণ করেন। দুই বছর পর ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে হযরত আলীর (রা) কনিষ্ঠ ভ্রাতা জাফর ইবনে আবু তালিব (রা)- এর নেতৃত্বে প্রায় একশ সদস্যের অপর একটি দল (৮৩ জন পুরুষ, ১৮ জন মহিলা) আবিসিনিয়ার অক্সামে পৌছান। ৬১৩ ও ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়ায় আশ্রয়গ্রহণকারীদের মধ্যে নবী করীম (সা) এর বিশিষ্ট কয়েকজন সাহাবা ছিলেন, যথা- সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা), আবদুল্লাহ ইবনে জাস (রা), উসমান ইবনে আফ্ফান (রা), (পরবর্তীকালে খোলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা) ও তদীয় স্ত্রী রুকাইয়া বিনতে মুহাম্মদ (সা) প্রমূখ। পরবর্তীকালে সাহাবারা আবিসিনিয়া থেকে মদিনায় ফিরে যান। কিন্তু সেই ৬১৫ খ্রিস্টাব্দেই সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) অপর দুইজন সঙ্গী নিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইথিওপিয়ার অক্সাম বন্দর থেকে নৌপথে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌছান। তিনিই প্রথম চট্টগ্রামবাসীদের নিকট ইসলামের বাণী পৌছে দেন। চট্টগ্রাম থেকে কামরূপ-মণিপুর হয়ে ৬১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি চীনের ক্যান্টন শহরে উপনীত হন। ক্যান্টন ও পার্শ্ববর্তী এলাকার হুই চাই (পরবর্তী কালে হুই হুই জনগোষ্ঠি নামে পরিচিত) জনগণের মধ্যে ইসলাম প্রচারের পর ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে তিনি আরবে ফিরে যান। এভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা) এর প্রিয় সাহাবী সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) এর মাধ্যমে ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে উপমহাদেশে চট্টগ্রাম সর্বাগ্রে ইসলামের অমিয় বাণীর সন্ধান পায়। অতঃপর কামরূপ ও মণিপুর। তারপর চীন। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। ৬১০-৬১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রসূল (সা) এর প্রিয় সাহাবায় উন্নীত হন। ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ১৭তম ব্যক্তি। তিনি হযরতের মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাব (রা) এর চাচাত ভাই ছিলেন। তিনি সুদক্ষ সেনাপতি ছিলেন। পারস্য সাম্রাজ্য (ইরান) বিজয়ে নেতৃত্ব দান করেন। ৬৩৭-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি পারস্য সম্রাজ্যের রাজধানী টেসিফন এর গভর্নর এবং ৬৪৫-৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার বুসরা আল শাম এলাকার গভর্নর ছিলেন। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) আরব-চীন কূটনীতির পুরোধা হিসাবে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। ক্যান্টনে তার স্মৃতি সংরক্ষিত আছে। চট্টগ্রামকে বলা হয় বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম। আবার এও বলে যে, পীর বদর আউলিয়ার চট্টগ্রাম। যখন যেভাবেই বলা হোক না কেন ইতিহাসে পবিত্র ইসলামের মর্মবাণী প্রচার-প্রসার এবং মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বদর পীরের অবদান অপরিসীম। হযরত বদরপীরকে চট্টগ্রামের অভিভাক পীর বা দরবেশ হিসেবে চিহিৃত করা হয়। বলা হয় তিনিই চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম মিশনারী। জ্বীন বা দৈত্য থেকে এক চাটি পরিমান জায়গা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ঐ জায়গায় পবিত্র আজান ধ্বনির মাধ্যমে পবিত্র ইসলামের বানী প্রচারে নিমগ্ন হন। তিনি যে চট্টগ্রামে প্রথম মুসলমান মিশনারী এ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতবিরোধ রয়েছে। চট্টগ্রাম-সাগর-নদী-পাহাড়ঘেড়া অঞ্চল। বহুমাত্রিক এ চট্টগ্রামে নামেরও বৈচিত্র্য রয়েছে। বহুমাতিত্রক এ চট্টগ্রামে নামেরও বৈচিত্র্য রয়েছে। এদেশ যখন বঙ্গপণ্ডু তখন কিরাত (চট্টগ্রাম) এ অঞ্চলের নাম। ইতিহাসবিশারদ পন্ডিত আবদুল হক চৌধুরী মহাভারতীয় ‘কিরাত’ অঞ্চলকে চট্টগ্রামের ভূখন্ড হিসেবে চিহিৃত করেন। প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ এ জনপদ চট্টগ্রাম। সাগরকূলের এ মানুষের এক সময় জীবন-জিবিকার পথ ছিল সাগর-নদী। মাঝি-মাল্লারা ধর্মীয় দৃষ্টিতে জ্বলে-জংগলে যেতে তারা পীর-মুরশিদকে স্মরন করত অতি শ্রদ্ধা আর পূর্নময় আশায়।ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাস বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আবদুল করিম-চট্টগ্রামে মুসলিম শাসন শিরোনামে প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন “চট্টগ্রাম বার আউলিয়ার দেশ, অর্থাৎ জনগণ বিশ্বাস করে যে, বারজন অলি-দরবেশ সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে এসে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। কবি মুহাম্মদ খানের সাক্ষ্য এই জনশ্রুতির ঐতিহাসিকতা স্বীকার করতে সাহায্য করে, যদিও কবি বারজন অলি দরবেশের নাম লিখেননি। শুধু মাতৃকুল পরিচয় দিতে গিয়ে কবি তার পূর্বপুরুষ শায়খ শারীফ-উদ-দীনের নাম উল্লেখ করেছেন যিনি কদল খান গাজীর “প্রেমের সখা” ছিলেন। অর্থাৎ বার আউলিয়ার অন্যতম ছিলেন। পরে পিতৃকুল পরিচয় দিতে গিয়ে কবি বদর আলমের নাম উল্লেখ করেছেন, তিনিও বার আউলিয়ার অন্যতম ছিলেন। কবি বলেন যে, তাঁর পূর্ব পুরুষ মাহি আছোয়ার যখন হাজী খলীল পীরকে সঙ্গে নিয়ে আরব দেশ থেকে চট্টগ্রামে আগমন করেন, চট্টগ্রামে কদম খান গাজী এবং শাহ বদর আলমের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। সুতরাং মুহাম্মদ খানের বংশ পরিচয়ে চট্টগ্রামের বার আউলিয়ার মধ্যে তিনজনের (অর্থাৎ কদম খান গাজী, শায়খ শরীফ-উল-দীন ও বদর আলম) নাম পাওয়া যায়। সোনার গাঁও এর সুলতান ফখর-উদ-দীন মুবারক শাহ্ মুসলমানদের মধ্যে সর্ব প্রথম চট্টগ্রামে মুসলিম শাসন প্রতিষ্টা করেন। কদম খান গাজী এবং বদর আলম তার সমসাময়িক। জনশ্র“তি মতে কদম খান গাজী- সুলতান ফখর-উদ-দীন মুবারক শাহের সেনাপতি ছিলেন। চট্টগ্রামে বদর পীরের প্রভাব এখনও বর্তমান। এখানে পীর বদর আলমের সমাধি ভবন আছে, ঐ এলাকা বদর পাতি নামে পরিচিত। বদর পীরের চাটির কথা এখনও সকলে ভক্তি ভরে স্মরন করে থাকে এবং কোন কোন লেখকের মতে বদর শাহের চাটির নামানুসারে চট্টগ্রামের নাম চাটিগ্রাম হয়। আবার কোন কোন লেখক মনে করেন যে, চট্টগ্রামের বদর শাহ্ ও বিহারের ছোট দরগাহে সমাহিত পীর বদর উদ-দীন-বদর-ই-আলম এক ও অভিন্ন।