শেখ হাসিনা ব্যর্থ হবেন না » কামরুল হাসান বাদল. লেখক, কবি সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব »

মানুষের জীবন বড়ই ছোট। নিতাইয়ের মতো আমাদের সবার মনেই সে আক্ষেপটি থাকে, ‘জীবন এত ছোট কেনো?’ লেখক হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন, ‘মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। মরে গেলাম ফুরায় গেল। তবে এটা আমার কাছে খুব পেইনফুল। একটা মানুষ এত ক্ষমতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে, ৭০ বা ৮০ বছর বাঁচে। এরপর শেষ। আর একটা কচ্ছপ সাড়ে তিন শ বছর বাঁচে। হোয়াই? কচ্ছপের মতো একটা প্রাণীর এত বছর বাঁচার প্রয়োজন কী?’
আমরা এমন একটি প্রজন্ম যারা পরাধীন দেশে জন্ম নিয়ে শিশুকাল কাটিয়ে কৈশোরকালে পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ। অ্যানালগ যুগে জন্ম নিয়ে ডিজিটাল যুগও দেখছি, তার সুবিধাও ভোগ করছি। সময় স্থির নয়, সদা প্রবহমান। কাজেই দুটি কালের যে প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার দাবি করছি তা পরিপূর্ণ নয়। আসলে সব কালে সবাই কিছু না কিছু পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছে। তবে সেসময়ের পরিবর্তন ছিল মন্থর, বর্তমান সময়ের মতো এত দ্রুত পরিবর্তনশীল ছিল না। হতে পারে ভবিষ্যতের দিনগুলো বর্তমানের চেয়ে অধিক পরিবর্তনশীল। কখনোই শেষ কথা, শেষ আবিষ্কার ও শেষ পরিবর্তন বলে কিছু নেই।
তারপরও তো জীবন। সে জীবনে কত কথা, কত স্মৃতিই না থাকে। তার কতটুকুই বা প্রকাশ করতে পারি আমরা। পুরো শিশুকাল নয়, তুলনামূলক কিছু চিত্র তুলে ধরা যাক।
টি অ্যান্ড টির অ্যাবরিবিউশান কী তা এখনকার প্রজন্মের অনেকেই জানে না। এটি হলো টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন। বর্তমানে সংস্থাটি বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) হিসেবে পরিচিত। একসময় যোগাযোগ ব্যবস্থা তো এত আধুনিক ছিল না। ফোনের প্রাথমিক স্তর ছিল টেলিগ্রাফ, টেলিগ্রাফ মেশিনের মাধ্যমে পাঠানো ক্ষুদে বার্তাকে বলা হতো টেলিগ্রাম। টরেটক্কা নামে একধরনের শব্দযন্ত্রের সাহায্যে মানুষ দূরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। টরেটক্কার টুংটাং শব্দ থেকেই অর্থপূর্ণ শব্দ বের করে নিতে পারতেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা। টেলিগ্রামের ভাষা থাকতো সংক্ষিপ্ত। ‘মাদার সিরিয়াস কাম সার্প’ সাধারণত এধরনের টেলিগ্রামই বেশি দেওয়া হতো। তখনকার সময়ে প্রতিটি সরকারি অফিসে টরেটক্কা মেশিনটি থাকতো। টেলিফোনও তখন খুব বেশি চালু হয়নি। টেলিগ্রাম করতে খরচ বেশি ছিল। পাকিস্তান আমলেই বোধহয় দু’টাকার মতো খরচ পড়তো।
সময়টা ১৯৬৯ সালের কোনো এক মাসের। বাবার কর্মস্থলে টেলিগ্রাম এলো, ‘মাদার সিরিয়াস কাম সার্প’। চট্টগ্রামে গ্রামের বাড়িতে দাদি থাকেন একা। অবশ্য একসাথে না হলেও পাশেই ছোটচাচার ঘর। দাদির অসুস্থতার খবরে মা-বাবা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। পুরো ঘটনা আমার স্মৃতিতে নেই। আবছায়া কিছু কিছু মনে পড়ে। উত্তরবঙ্গ থেকে বাড়িতে ফিরতে সেসময় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগতো। আমার মুমূর্ষু দাদির জন্য অনেক খোঁজাখুঁজি করে এবং অনেক দাম দিয়ে আঙুর, নাসপাতি, কমলা, আপেলসহ বিদেশি অনেক ফলমূল কেনা হলো। যার মধ্যে অনেককিছুর চেহারা আগে দেখিনি।
বাড়িতে পৌঁছে দেখা গেল দাদি অনেকটা সুস্থ ও স্বাভাবিক। আমাদের আর আনন্দের সীমা রইল না। সে আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিল দাদির জন্য কেনা দামি-দুর্লভ বিদেশি ফলমূল। আমি যে সময়ের কথা লিখছি তার আগে তো বটেই এরপরও অনেক বছর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই ফলমূলগুলো ছিল অধরা, অদেখা। তারা মনে করত, এবং বিশ্বাস করত এই ফলগুলো বেহেস্তের মেওয়া। বেহেস্তবাসীদের এই ফলমূল খেতে দেওয়া হয়। মৃত্যুপথযাত্রীদের ঠেসে ঠেসে এই ফল বা ফলের রস খাওয়ানো হতো। সাধারণ মানুষ এই ফলগুলো চোখেও দেখতো না। আমার একটু একটু মনে আছে আমাদের বাড়ির অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ফলগুলো দেখতে এসেছিল।
আজ বাংলাদেশের এমন কোনো বাজার নেই, এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে দুচারটি বিদেশি ফলের দোকান নেই। বিত্তবানদের কথা বাদ দিলাম, দিনমজুরের ঘরেও এখন এমন ফলমূল কেনা হয়, খাওয়াও হয়।
এখনকার সম্পন্ন পরিবারের শিশুরা প্রতিবেলা চিকেন না থাকলে মুখে ভাতই তোলে না। আমরা বছরে দুয়েকবার খেতে পারতাম মুরগির মাংস। একসময় একটি মুরগি জবাই করা ছিল খুব বড়সড় ব্যাপার। ঘরে জামাই এলে, মুসলিম পরিবারে মোহররমে এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এলেই শুধু মুরগি জবাই হতো। এ জবাই আবার সবাই দিতে পারতো না। পাড়ার মসজিদের ইমাম তার অবর্তমানে মুয়াজ্জিন ‘পূর্ণ হালালভাবে’ মুরগি জবাই করতেন এবং এর বদলে বা সৌজন্যবশতঃ মুরগির মাথা, কলিজা ও দুয়েকটুকরা মাংস মসজিদে হুজুরদের কাছে পাঠানো হতো। এখনকার মতো পাড়ায় পাড়ায় মুরগির দোকান, গরুর মাংসের দোকান ছিল না। গ্রামে হাটবারে এবং নগরে নির্ধারিত বাজার ছাড়া কাঁচাবাজার করা সম্ভব ছিল না। গ্রামে আবার সব হাটে গরুর মাংস পাওয়া যেত না কারণ একটি গরুর সম্পূর্ণ মাংস বিক্রি হওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে গরু জবাই করতো না কসাইরা। যেকারণে গরুর মাংস কিনতে হলে বড় হাটে যেতে হতো।
এখনকার মতো এত মেজবানও হতো না, তখন সামর্থবান লোকের সংখ্যাও ছিল কম। এত খাওয়া-দাওয়া, এত শান-শওকত, এত হোটেল-রেস্তোরাঁ, এত মার্কেট-শপিংমল, এত কমিউনিটি সেন্টার, এত বর্ণিল রাস্তাঘাট তখন ছিল না। মানুষ খুব সামান্যতেই সন্তুষ্ট হতো। খুব সাধারণ খাওয়া-দাওয়া ছিল, জীবনযাপন ছিল, লোক দেখানো বা বড়লোকি ভাবসাব ছিল না। ধনী লোকের সংখ্যা সমাজে কম ছিল। দারিদ্র্য ছিল প্রকটভাবে। তবে সমাজে বর্তমানের মতো এত অসৎ, প্রতারক, বাটপার মিথ্যুক মানুষ ছিল না। তখন সমাজে ধার্মিক ছিলেন, বকধার্মিক ছিল না। মানুষ ধর্ম পালন করত সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায়ের জন্য। বর্তমানের মতো ধর্মকে চুরির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো না।
আমরা নতুন কাপড় পেতাম বছরে একবার, ঈদের সময়ে। এছাড়া পরিবারের কারো বিয়ে বা কোনো কারণে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে নতুন কাপড় কপালে জুটতো। বড়জনের ছোট হওয়া কাপড়, জুতো ছিল ছোটজনের নতুন প্রাপ্তি। একটি মামলেট খেতে হয়েছে চারজন ভাগ করে। এটা খাব না, ওটা খাব না এমন জেদ করার ভাগ্য আমাদের সময়ের খুব কম সন্তানেরই হয়েছে। সুনীলের কবিতা-
‘একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও!’ (কেউ কথা রাখেনি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
সেই কিশোরের মতোই ছিল আমাদের অধিকাংশের জীবন।
এখনকার শিশুরা স্কুলে যায়, যাদের গাড়ি আছে তাতে যায়, অন্যদের মা-বাবারা পৌঁছে দেয়। অনেকের অভিভাবক ক্লাস চলাকালীন স্কুলেই বসে থাকেন। টিফিনবক্স ভরে টিফিন দেন। আমরা স্কুলে যেতাম-আসতাম নিজেরাই। টিফিনবক্স তো দূরের কথা টিফিনের টাকাও পেতাম না। স্কুলের সামনে বিক্রি হওয়া খাবার খাওয়া নিষেধ ছিল মা-বাবার; কাজেই, ‘লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা’। আমরা এভাবেই বড় হয়েছি।
আমাদের সময়ে বলপেন ছিল না। সত্তর দশকের শেষ থেকে বলপেন চালু হলেও তা দিয়ে লেখা ছিল নিষিদ্ধ। আমরা ব্যবহার করতাম ফাউন্টেন পেন। সে কলমে কালি ভরতে হতো। বাজারে কালির দোয়াত পাওয়া যেত। টাকা বাঁচানোর জন্য অনেক সময় কালির দোয়াতের পরিবর্তে কালি বানানোর বড়ি বা ট্যাবলেট কিনে আনা হতো। সে বড়িকে পানিতে মিশিয়ে কালি বানাতে হতো। মাঝেমধ্যে ছিদ্র হয়ে কলমের কালিতে স্কুলড্রেসের পকেটের নিম্নাংশ গভীর দাগ হয়ে যেত। কলমের দোষে ব্যাপারটি ঘটলেও তার জন্য অবধারিত শাস্তি পেতে হতো আমাদের। আমাদের সময়ে প্রতিদিন অন্তত একবার মারের সম্মুখীন হতে হতো সেটা স্কুলে, বা হাউস টিউটরের কাছে নয়তো মা-বাবা- বড় ভাই যেকোনো একজনের কাছে। স্কুলে শিক্ষকের হাতে মার খাওয়া ছিল আমাদের শিক্ষাগ্রহণের অন্যতম একটি অংশ। মা-বাবারা মনে করতেন শিক্ষকের মার না খেলে মানুষ হওয়া যাবে না। আর শিক্ষকরাও মনে করতেন, ‘হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা/ পিটিয়ে ছাগল ম্যান করেঙ্গাৃ'(লুৎফর রহমান রিটন)। গরু পিটিয়ে মানুষ করার মতো। বর্তমানে এমন পরিস্থিতি নেই। এখন শিক্ষকরাই তটস্থ থাকেন শিক্ষার্থীদের সামনে। এখনকার মা-বাবারা সন্তানের গায়ে হাত তোলেন না উল্টো শিশুদের অসতর্ক কিল-ঘুষি থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেন।
চায়ের দোকানে বসে অর্ডার করতাম তিন কাপ চা আর দুইটা খালি কাপ। অর্থাৎ তিন কাপ চা পাঁচজনে ভাগ করে খেতাম। একটা সিগারেট টানতাম তিনজনে মিলে।
এখন প্রায় সবার হাতে মোবাইল ফোন।কয়েক বছর আগের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দশ কোটির ওপর। এখন নিশ্চয়ই আরও বেড়েছে। আমাদের তরুণ ও যৌবনকালে একটা ফোন করার কতই না চেষ্টা করতাম কিন্তু সুযোগ ছিল না। পাড়ায় যাদের ঘরে ফোন থাকতো তারা অনেক অভিজাত বলে বিবেচিত হতেন। আশেপাশের অনেকে তাদের তোয়াজ করে চলতেন কারণ প্রয়োজনের সময় ফোন করা বা ফোন এলে ডেকে দেওয়ার আশায়। তখন অনেক দোকান থেকে টাকার বিনিময়ে ফোন করা যেত। অনেকে ফোনের সামনে একটি টিনের বাক্স রাখতেন। প্রতিকলের জন্য দিতে হতো দু’টাকা। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে পাবলিক টেলিফোন কল সেন্টার চালু হলো। মেশিনে কয়েন ফেলে কল করা যেত। অনেক সময়ে প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে লম্বা কথোপকথনের কারণে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কলহ-বিবাদও লেগে যেত।
সেসময় ফোনে ক্রসকানেকশন ছিল একটি ঝামেলার ব্যাপার। তবে এই ক্রশকানেকশন থেকে অনেক বিখ্যাত প্রেমেরও জন্ম হয়েছে। আমি একবার ঢাকায় মগবাজারে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ফোন করতে গিয়ে ক্রসকানেকশনে পড়ে চট্টগ্রামের এক প্রেমিকযুগলের আঞ্চলিক কথোপকথন শুনতে পেয়েছিলাম। তখন টেলিফোন ছিল অ্যানালগ সিস্টেমে। এখন অবশ্য ডিজিটাল হওয়ায় সার্ভিস অনেক উন্নত হয়েছে।
নতুন শতকে এসে বিশেষ করে গত দশ-বারো বছরে বাংলাদেশের পরিবর্তন হয়েছে অভাবনীয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল ৭ শ ৮৬ কোটি টাকার। আর বর্তমানে অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট হচ্ছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার।
আজ যার বয়স ত্রিশের নিচে তার কাছে আমার এই লেখার বিষয়বস্তু আজগুবি বলে মনে হতে পারে। যে দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে আমাদের দিন গেছে একসময়, যে দেশকে একেবারে সম্ভাবনাহীন বলা হয়েছিল, যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করা হয়েছিল সে দেশটি আজ বিশ্বের উন্নয়নের রোলমডেল। অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। বিদেশি সাহায্য ছাড়া যে দেশটি চলতে পারবে না বলা হয়েছিল সে দেশ আজ শ্রীলঙ্কার মতো দেশকে অর্থঋণ দিচ্ছে। এটি অভাবনীয়, এটি বিস্ময়কর।
এই অভিযাত্রায় মহামারি কিছুটা ছন্দপতন ঘটালেও তা কাটিয়ে উঠতে উঠতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ এবং যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর আমেরিকা ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির তাগাদা দিয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে সম্ভাব্য সে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে বাংলাদেশ।
লেখক : কবি-সাংবাদিক