সাদা আর কালো বাইরে কেবল

কামরুল হাসান বাদল- লেখক কবি ও সাংবাদিক:
কৌতুকটা সবার জানা। তারপরও লেখাটি শুরু করতে চাই এটা দিয়ে।
কৃষকের সাক্ষাৎকার নিতে গেছেন এক সাংবাদিক। তাদের কথোপকথন-
: আপনি ছাগলরে কী খাওয়ান?
: কোনটারে? কালোটা না সাদাটারে?
: কালোটারে
: ঘাস…
: আর সাদাটারে?
: ওইটারেও ঘাসই খাওয়াই
: ও আচ্ছা! এগুলোরে কই বাইন্ধা রাখেন?
: কোনটা? কালোটা না সাদাটা?
: সাদাটা
: ওইটারে বাইরের ঘরে বাইন্ধা রাখি।
: আর কালোটা?
: ওইটারেও বাইরের ঘরে বান্ধি।
: আর গোসল করান কীভাবে?
: কালোটা না সাদাটা?
: কালোটা
: পানি দিয়া
: আর সাদাটা?
: ওইটারেও পানি দিয়া করাই
এবার উপস্থাপক বিরক্তি নিয়ে বললেন, সবকিছু যখন একই রকম করেন, তাহলে বারবার জিগান ক্যান কালা না সাদা?
নির্বিকার কৃষক জবাব দিলেন, কারণ সাদা ছাগলটা আমার।
উপস্থাপক- ও! আর কালোটা?
কৃষক খুব সরলভাবে হেসে জবাব দিলেন- ওইটাও আমার।
হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, মানুষ সিংহের প্রশংসা করে কিন্তু আসলে গাধাকেই পছন্দ করে। পছন্দ করার কারণ হলো সে ঝামেলা করে না। প্রতিবাদ করে না। অধিকাংশ মানুষ ‘অনুগত প্রাণী’কে পছন্দ করে।
গাধা একটি নিরীহ প্রাণী। প্রাণীটি যে অন্য প্রাণীদের তুলনায় বোকা তার কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যতা নেই। তেমনি আবার শেয়ালের বেলায়ও তাই। শেয়লাকে ধূর্ত বলে মনে করা হলেও এবং শেয়ালের চালাকি ও ধূর্তামি নিয়ে অজস্র গল্প সমাজে প্রচলিত থাকলেও শেয়াল যে চালাক বা ধূর্ত তারও বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো তথ্য নেই। তারপরও শত শত বছর ধরে গাধাকে বোকা আর শেয়ালকে ধূর্ত বা চালাক মনে করে এসেছে মানুষ। তবে গাধার চরিত্রে একটি বৈশিষ্ট্য আছে, তা হলো সব সময় শান্ত থাকা, নির্বিরোধী থাকা। তার নির্বিরোধী চরিত্রের কারণেই মানুষ গাধাকে বোকা হিসেবে ধরে নিয়েছে। আর শেয়াল নিজেকে রক্ষা করার এবং শিকার খোঁজার ক্ষেত্রে বেশ পারদর্শী ও কৌশলী বলে শেয়ালকে ধূর্তের প্রতীক করা হয়েছে।
শেয়াল ও গাধা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। পাঠকদের বেশির ভাগেরই তা জানা। তাই আজ শেয়াল ও গাধার গল্প না বলে ছাগল নিয়ে বলি। আমাদের গ্রামগঞ্জে একটি প্রবাদ আছে ‘ছ’ল পালে প’লে’ অর্থাৎ ছাগল পালে পাগলে। ছাগলের সঙ্গে পাগলের মিল আছে বলেই কথাটি বলা হয়, নাকি ছাগল পালা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বলে বলা হয়, তা আমার জানা নেই। থাক সে কথা।
আমাদের দেশে অবশ্য ছাগল শব্দটিও এক প্রকার গালি। মাথামোটা বা বোকা বোঝাতে অনেকে ছাগল শব্দটি ব্যবহার করে। ‘ব্যাটা একটা আস্ত ছাগল’ এ ধরনের। ছাগল থেকে ছাগু শব্দটির উৎপত্তি। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় থেকে ছাগু শব্দটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছেলেপুলেরা জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধীদের এই নামেই সম্বোধন করে থাকে। তরুণ প্রজন্মের কাছে এখন ছাগু মানেই সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ, মৌলবাদী কেউ।
এই ছাগু বা ছাগলরা বেশ সক্রিয়। বিশেষ করে ইন্টারনেট জগতে। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিবিরোধী প্রচারণায় এরা বেশ সিদ্ধহস্ত। গণজাগরণ মঞ্চের আগে-পরে ও আন্দোলন চলাকালে এরাই বিভিন্ন লেখক, ব্লগারদের নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি আখ্যা দিত। এমন প্রচারণার ফলে অনেক লেখক-সংস্কৃতিকর্মীকে প্রাণ দিতে হয়েছে জঙ্গিদের হাতে।
ওই কৃষকের ছাগলের মতো বাংলাদেশেও সাধারণত দুই প্রকার ছাগল আছে, কালো ও সাদা। কালো ছাগলরা বেশ প্রকাশ্য। এরা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়ে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পাকিস্তানিদের পক্ষে অস্ত্র ধরেছে। এ দেশে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগে পাকিস্তানকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করেছে। এই কালো ছাগলরা পাকিস্তানিদের পক্ষে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে শান্তি কমিটি গঠন করেছিল। হত্যা-ধর্ষণে লিপ্ত ছিল এরাও। এরা বাংলাদেশ চায়নি। ফলে স্বাধীন হলেও এরা বাংলাদেশকে মেনে নেয়নি। স্বাধীনতার পরে লন্ডনে গিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করেছিলেন ছাগলদের শিরোমণি গোলাম আযম।
এরা কালো ছাগল। এরা এখনো পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখে। ক্রিকেট খেলায় পাকিস্তান বাংলাদেশকে হারালে এরা খুশি হয়। এরা কাশ্মিরের মুসলিমদের জন্য কেঁদেকেটে হয়রান হয়। ফেসবুকে কবিতা লেখে। কিন্তু নিজ দেশে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হলে নিশ্চুপ থাকে। এরা এখনো জিহাদের স্বপ্ন দেখে। এরা আওয়ামী লীগ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে ইসলামের শত্রæ মনে করে।
এই ছাগলদের প্রধান টার্গেট শেখ হাসিনা। তাই শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে অন্তত ২৪ বার আক্রমণ করেছে তারা। এরা স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা প্রকার প্রোপাগান্ডা চালাত। যে দুটি দেশ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিল, ভারত ও রাশিয়া তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিত-‘রুশ-ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’ বলে। তারা একাত্তর থেকে শুরু করে আজ অবধি বলে আসছে আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছে। এদের মধ্যে শীর্ষ ছাগলরা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে এখনো হিন্দু বলে প্রচার করে।
এই কালো ছাগলদের নিয়ে একটি সুবিধা আছে আমাদের। তা হলো, এদের আমরা সহজেই চিনতে পারি। ফলে এদের প্রতিহত করা সহজ। সমস্যা হয় সাদা ছাগলদের নিয়ে। এদের দেখে বোঝার উপায় নেই এরা ছাগল। দেখে এদের কোনো সুন্দর ও দামি প্রাণী বলে মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা কালো ছাগলদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সাদা ছাগলদের দেখে বেশ ভক্তি লাগে। এরা ভালো ভালো কথা বলে। সমতার কথা, প্রগতির কথা, অধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলে। পৃথিবীর তাবৎ ভালো কথাগুলো শুধু এরাই আউরে যায়। টেলিভিশনে এসে খুব ভালো ভালো কথা বলে। সরকার ও জনগণকে শুধু শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে এদের কোনো সংশ্রব নেই। সাদা হলেও এদের আচরণও কালো ছাগলের মতো। এরাও ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করার অভিযোগ তোলে সরকারের বিরুদ্ধে। ভাষা ভিন্ন হলে সাদা ও কালো ছাগলের উদ্দেশ্য একই। সাদা আর কালো বাইরে কেবল।
সাদা ছাগলরা সাধারণত নির্বাচনের আগে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার, কখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, কখনো মানবাধিকার, কখনো গণতন্ত্র রক্ষার দাবি ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে মাঠ গরম করে। এদের ইন্ধন দেয় আরেকটি সাদা রঙের পত্রিকা, যারা বদলে যাওয়ার স্লোগান দেয়। পুরো আয়োজনটির নেপথ্যে থাকে বিশ্বমোড়ল নামের দেশটি।
এদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, সারা বিশ্বে এখন একটিমাত্র সমস্যা আর সেটি হলো বাংলাদেশে তাদের ভাষায়, ‘একটি গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন। আবার সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। গ্রহণযোগ্য হতে হলে আওয়ামী লীগকে পরাজিত হতে হবে। ভালো কথা আওয়ামী লীগ সব সময় জিতবে কেন? তাকে অবশ্যই হারতে হবে। কারণ মানুষ পরিবর্তন চায়। খুব ভালো কথা। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কার কাছে হারবে? একাত্তরের পরাজিত শক্তির কাছে? ‘পরিবর্তন’ শব্দটি সাধারণত ইতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কাজেই পরিবর্তন হওয়া মানে বর্তমানের চেয়ে ভালো কিছু হওয়া। মানুষ যদি পরিবর্তন চায় তা হলো বর্তমানের চেয়ে ভালো কিছু চায়। এখন প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের স্থানে বিএনপি-জামায়াত কোন অর্থে ভালো? শেখ হাসিনার স্থানে খালেদা বা তারেক জিয়া কোন বিবেচনায় ভালো? বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে জামায়াত ক্ষমতায় আসা, জামায়াত ক্ষমতায় আসা মানে মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসা, মৌলবাদীরা ক্ষমতায় আসা মানে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়া। আর জঙ্গিবাদীরা ক্ষমতায় এলে দেশের কী পরিণতি হবে, তা তো আফগানিস্তানকে দেখেই অনুমান করা যাচ্ছে। তাহলে কি কোনো শক্তি উদীয়মান বাংলাদেশকে ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তানের মতো ধ্বংস করে দিতে চায়? আর তাদের এজেন্ডাই কি বাস্তবায়ন করতে চায় দেশের সাদা ছাগলরা?
যে বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ, সেখানে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিলে তা গণতন্ত্রবিরোধী তো হবেই না, বরং গণতন্ত্রকে সুরক্ষাই দেয়া হবে। যে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে বা সুযোগ নিয়ে চরম অগণতান্ত্রিক মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত হবে, সে গণতন্ত্র খানিকটা নিয়ন্ত্রিত থাকা দোষের নয়।
এখন যে সমস্যা, সেটা নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও সমাধানে পৌঁছাবে না। তার জন্য যে মানবিক জাগরণের দরকার, তা করতে পারেনি বাংলাদেশের প্রগতিশীল ঘরানার দলগুলো। অবশ্য এর দায় আওয়ামী লীগের ওপরও বর্তায়। যদি করা যেত, তাহলে পরিবর্তনের নামে উত্তপ্ত কড়াই থেকে জলন্ত চুলায় পড়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
আজ উপমহাদেশজুড়ে ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা বিরাজমান। যে কারণে ধর্মীয় রাজনীতির জয়জয়কার। ভারতে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায়। দেশের মানুষকে তারা অবদমিত করছে ধর্মকে ব্যবহার করে। এই শক্তির কারণে ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কোণঠাসা। বাংলাদেশে চিত্রটি উল্টো। এখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে দুর্বল করতে সরকারই বাধ্য হয়ে গণতন্ত্রকে সীমিত করছে। চাইছে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। ভাবতে হবে দিনশেষে মানবতার জন্য, উন্নয়ন ও প্রগতির জন্য কোনটি ভালো।
লেখাটি শেষ করার আগে শুরুতে ফিরে যাই। ছাগল সাদা হোক বা কালো হোক দুটোকে একই জায়গায় রাখে কৃষক।
কামরুল হাসান বাদল : কবি ও সাংবাদিক।