রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করতে হলে

কামরুল হাসান বাদল লেখক : কবি–সাংবাদিক

অধুনা অনেকে বুঝে হোক, না বুঝে হোক প্রায়সময় বলে থাকেন, ‘I Hate Politics’। বিশেষ করে এই প্রজন্মের অনেকের কাছে এটা বলা একপ্রকার ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য অনেক বয়স্করাও কথাটা বলে থাকেন। এর জন্য আমি তাদেরকে পুরোটা দায়ী করি না।
বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশে বিরাজনীতি করণের একটি অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০০৭/৮ সালে সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একশ্রেণীর সংবাদপত্র, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল শ্রেণীর একটি অংশ রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের খাটো করে বিকল্প পদ্ধতি আবিস্কারের চেষ্টা করেছিল। সে সময় হাসিনা–খালেদাকে রাজনীতি থেকে বিদায় করার লক্ষ্যে ‘মাইনাস টু‘ থিউরির কথা খুব বেশি বেশি শোনা গিয়েছিলো।
কিন্তু সৌভাগ্য হচ্ছে দেশের জনগণ তা মেনে নেয়নি। কাজেই বিরাজনীতিকরণের অপচেষ্টা হোঁচট খেয়েছিল।
অবশ্য এটা নতুন নয়। এর আগে জেনারেল এরশাদ, তার আগে জেনারেল জিয়া এবং তারও আগে এই উপমহাদেশে প্রথম সফল! সামরিক শাসক জেনারেল আইউব খান একই কৌশলে রাজনীতিবিদদের হেয় করার সবধরনের চেষ্টা করেছিলেন। তবে জেনারেল আইউব খান প্রথম সামরিক অভ্যুত্থানকারী ছিলেন না। তাঁর আগে জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। কিন্তু মাত্র কুড়ি দিনের মাথায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইউব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
দেশভাগের পর ভারত যখন গণতান্ত্রিক পন্থায় একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের ভিত মজবুত এবং স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার কাজে ব্যস্ত সে সময় পাকিস্তানে চলছে একেরপর পর অপরাজনীতি, ষড়যন্ত্র ও হত্যার রাজনীতি। ভারত যখন তার সমস্ত প্রদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়, ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থার সুসমন্বয় সাধনে ব্যস্ত ঠিক একই সময়ে পাকিস্তানি শাসক ও সামরিক বাহিনী তাদের ক্ষমতা বিস্তার এবং পূর্ব বাংলায় নয়া পাকিস্তানি উপনিবেশ গড়ে তোলার ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত। লক্ষণীয় বিষয় হলো, একই সময়ে স্বাধীন হওয়া দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে নানা জাতি, নানা ভাষা ও সংস্কৃতির বৃহৎ ভারতে আজতক রাজনীতি ও ক্ষমতা বদল প্রক্রিয়ায় ভারতের সেনাবাহিনী আগ্রহ না দেখালেও পাকিস্তানে হয়েছে তার উল্টো। শুরু থেকে আজতক পাকিস্তানে সরকার পরিবর্তন ও শাসনকার্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই পাকিস্তানে গণতন্ত্র আজ পর্যন্ত কোনোরূপ প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করেনি।
ভাষা আন্দোলনে জনতার দাবির কাছে নতি স্বীকার এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ের গ্লানি থেকে মুক্ত হতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চেষ্টা করেছে এ দেশে রাজনীতির সুষ্ঠু বিকাশের পথ রুদ্ধ করতে। এই হীন উদ্দেশ্য থেকে আইউব খান ‘বেসিক ডেমোক্রেসি‘ বা মৌলিক গণতন্ত্র নামে অদ্ভুত এক রাজনৈতিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন। এখানেও লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের দুই সামরিক শাসক রাষ্ট্র শাসনে তাদের পূর্বসূরী আইউব খানের অনেক নীতিকে অনুসরণ করেছেন। আইউব খান যেমন রাজনীতিবিদদের নামে নানা ধরনের কুৎসা রচনা করে প্রথমে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা তুলে নিয়েছিলেন ঠিক একই কায়দায় জিয়া এবং এরশাদও রাজনীতিকদের কেনাবেচার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অনাচারকে লালন করেছিলেন।
জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াই প্রথম নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে বিভিন্ন দলের নেতাদের কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে প্রলোভন দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনেছেন। শেষে দলছুট নেতাদের নিয়ে নিজেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। এরশাদও নীরব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে টিকে থাকার জন্য তাঁর পূর্বসূরী জিয়াকে অনুসরণ করে দলছুটদের নিয়ে নিজের দল গঠন করেছেন যেখানে বিএনপি ছেড়ে আসা নেতার সংখ্যাও কম ছিল না।
আসলে যে যাই বলুক রাজনীতিকে বাদ দিয়ে কোনোকিছু অর্জন করা কখনো সম্ভব নয়। এ উপমহাদেশ থেকে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে রাজনীতির কারণে। বাঙালি যে তার হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলো তা–ও রাজনীতির কারণে। যে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইউরোপে রেনেসাঁস হলো, অভিজাততন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে জনগণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল সেটিও রাজনীতির কল্যাণে।
আসলে রাজনীতি কোথায় নেই? জন্মের পর প্রচণ্ড আলো সহ্য করতে না পেরে যে শিশু ক্রন্দন করে সেটা তার অস্বস্তির প্রকাশ, তার প্রতিবাদ, এটাও রাজনীতি। যে শিশু ক্ষুধায় কাতর হয়ে কাঁদে সেটাও রাজনীতি। রাজনীতির বাইরে কিছু নেই। আসলে দোষ রাজনীতির নয়। দোষ হলো কিছু ভ্রষ্ট রাজনীতিকের, কিছু বহিরাগত অরাজনীতিকের যারা রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন, অসততা, আদর্শহীনতা আর আখের গোছানোর চর্চা করেছেন বা করছেন। এদের জন্য রাজনীতি কলুষিত হয়েছে। বর্জন করলে এসব রাজনীতিবিদকে করা দরকার, রাজনীতিকে নয়। এই মতলববাজদের কারণে রাজনীতির প্রতি অনীহা জানাচ্ছে অনেকে। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এই ধারা পরিবর্তনের জন্য, রাজনীতিতে সুস্থ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সৎ রাজনীতিবিদদের দলে আসার সুযোগ করে দিতে হবে। সৎ, নিষ্ঠাবান, দেশপ্রেমিক প্রজন্মকে রাজনীতির প্রতি উৎসাহী করে তুলতে হবে।
বর্তমান রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করতে গেলে একটু পিছনে তাকাতে হবে। ভারত ভাগ হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। শুরুতে ভারত নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুমত ও পথের সহাবস্থানকে সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করলেও অপর রাষ্ট্র অর্থাৎ পাকিস্তান শুরু থেকে পাকিস্তানকে একটি সামপ্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। ভারত ১৯৭৬ সালে সংবিধানে ‘সমাজতান্ত্রিক’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সংহতি’ এবং সকল নাগরিকের মধ্যে ‘ভাতৃভাব’–এই শব্দগুলো যুক্ত করে।
তবে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালেই সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দেয়। এই উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে কিছু অভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু আছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। বক্ষমান নিবন্ধে কয়েকবার উল্লেখ করেছি যে, ভারত প্রথম থেকে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি মেনে চলার চেষ্টা করেছে যা পাকিস্তানে হয়নি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক পরে জিয়া, এরশাদ, খালেদা এই নীতির বিপরীতে ধর্মভত্তিক রাজনীতিকে লালন করেছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুই স্বাধীন দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। মোশতাক–জিয়া ক্ষমতায় এসে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে দেশে সামপ্রদায়িক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। আজ উপমহাদেশ জুড়ে এই সামপ্রদায়িক রাজনীতিই সকল অনিষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করার ফলে অসাধু ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। কারণ এরা সবসময় মানুষের অনুভূতিকে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এদের দুর্নীতি, অপকর্ম নিয়ে প্রতিবাদ করলে তা ধর্মীয় অবমাননা হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে। এভাবে ধর্মকে পুঁজি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকে। যেমন পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বর্তমান বিজেপি শাসিত ভারত।
এই পন্থাও নতুন নয়। মধ্যযুগে ইউরোপের দেশে দেশে খ্রিস্টান পাদ্রিরা রাজা–বাদশাহের পক্ষ নিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে দাসে পরিণত করে রাখতো। সে অত্যাচার–উৎপীড়নের বহু করুণ কাহিনি আছে। ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইউরোপে সে যুগের অবসান হলেও এই উপমহাদেশে সেই যুগটাই যেন নতুন করে ফিরে আসছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিবছর সুখী দেশের তালিকা প্রকাশ করে। ‘সুখ‘ শব্দটি আপেক্ষিক হলেও সুখী বলতে দৃশ্যমান কিছু বুঝতে পারি আমরা। এমন বাসযোগ্য দশটি দেশের তালিকায় যে দেশগুলোর নাম থাকে সে দেশগুলোর আর্থ–সামাজিক, বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে বসবাসের অযোগ্য দশটি দেশের রাজনীতি এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের তুলনামূলক বিচার করলে বোঝা যাবে মূল সমস্যাটি কোথায়। বর্তমান ভারত এবং ২০ বছর আগের ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের অপকারিতা কী। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে ত্রিশ বছর আগের রাজনীতির তুলনা করলেও তেমন উপলব্ধি হবে নিশ্চয়ই।
মূল কথাটি হলো, রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করা গেলে সমাজের সকল ক্ষেত্র পরিশুদ্ধ হবে আর রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করতে হলে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করতে হবে। ধর্মকে বিশ্বাসের জায়গায় রাখতে হবে। কারণ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কখনোই মানবকল্যাণ বয়ে আনেনি, কখনো আনবেও না।
লেখক : কবি–সাংবাদিক